পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ও সহনশীল জীবগুলোর মধ্যে শ্যাওলা অন্যতম। দীর্ঘ খরার সময় এরা শুকিয়ে প্রায় মৃতের মতো হয়ে যেতে পারে, আবার বৃষ্টির কয়েক ফোঁটা জল পেলেই মুহূর্তে সবুজ প্রাণ ফিরে পায়। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুকাভূমি থেকে শুরু করে পাথুরে পাহাড়, এমনকি ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশ তৈরির সম্ভাব্য উপাদান হিসেবেও শ্যাওলার নাম উঠে আসে। কিন্তু সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা শ্যাওলার ভেতরে এমন একটি অপ্রত্যাশিত বিষয় আবিষ্কার করেছেন, যা উদ্ভিদবিজ্ঞানের বহুদিনের ধারণার থেকে সম্পূর্ণই আলাদা।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রিভারসাইডের (ইউ সি আর) গবেষকেরা মরুভূমির শ্যাওলা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এর ভেতরে এক অপ্রত্যাশিত বাসিন্দার সন্ধান পেয়েছেন। সেটি হল একপ্রকার ছত্রাক। শুধু বাইরের পৃষ্ঠে নয়, শ্যাওলার নিজস্ব কোষ ও কলার ভেতরেই এই ছত্রাকের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে।
সম্প্রতি এই গবেষণাটিরই সম্পূর্ণ বিবরণ নিউ ফাইটোলজিস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। যদি এই সম্পর্কটির সত্যতা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়, তবে এটি শুধু শ্যাওলার জীববিজ্ঞান সম্পর্কেই নতুন ধারণা দেবে না, বরং প্রায় ৪৭০ মিলিয়ন বছর আগে উদ্ভিদ কীভাবে সমুদ্র ছেড়ে স্থলভাগে বসতি স্থাপন করেছিল, সেই ইতিহাসও নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করবে।
স্থলজ উদ্ভিদের জগতে ছত্রাকের সঙ্গে সহাবস্থান কোনো নতুন বিষয় নয়। বর্তমানে যা জানা যাচ্ছে তাতে, পৃথিবীর ৮৫ শতাংশেরও বেশি স্থলজ উদ্ভিদ বিভিন্ন ছত্রাকের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই ছত্রাকগুলো মাটি থেকে উদ্ভিদের জন্য পুষ্টি সংগ্রহ করে দেয়, আর বিনিময়ে উদ্ভিদ থেকে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে উৎপন্ন শর্করা পায়। বিশেষ করে “আরবাসকুলার মাইকোরাইজাল ফাঙ্গাই” (AMF) নামে পরিচিত ছত্রাকগোষ্ঠী অধিকাংশ উদ্ভিদের সঙ্গে যুক্ত থাকে। কিন্তু শ্যাওলাকে এতদিন এই ব্যবস্থার বাইরে বলে মনে করা হতো। এবং মনে করা হতো পৃথিবীতে বিদ্যমান প্রায় ১০,০০০ প্রজাতির সব শ্যাওলাই এই ধরনের সম্পর্ক ছাড়াই স্বতন্ত্রভাবে বেঁচে থাকে।
এটাই ছিল প্রচলিত বৈজ্ঞানিক ধারণা। কারণ শ্যাওলার প্রকৃত শিকড় নেই, আর মাইকোরাইজাল ছত্রাক সাধারণত উদ্ভিদের শিকড়ের সঙ্গেই সম্পর্ক গড়ে তোলে। কিন্তু নতুন এই গবেষণা তো অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে। গবেষণার প্রধান অংশ পরিচালনা করেন ইউসিআরের ডক্টরাল গবেষক কিয়ান কেলি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মোহাভি ও সোনোরান মরুভূমির চরম পরিবেশে দীর্ঘ সময় ধরে শ্যাওলার নমুনা সংগ্রহ করেন। যেখানে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটেরও বেশি পৌঁছে যায়, সেই অনুর্বর ভূমিতে তিনি খুঁজে পান জীবনের এক বিস্ময়কর জগৎ। যার নাম বায়োলজিক্যাল সয়েল ক্রাস্ট।
এটি এমন এক ক্ষুদ্র বাস্তুতন্ত্র, যেখানে ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, শৈবাল, শ্যাওলা এবং অণুজীব একসঙ্গে বসবাস করে। গবেষকেরা মরুভূমির শুষ্ক অঞ্চল এবং তুলনামূলক আর্দ্র এলাকার একই ধরনের শ্যাওলার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেন, যাতে বোঝা যায় পরিবেশগত পার্থক্য ছত্রাকের উপস্থিতিতে কোনো প্রভাব ফেলে কি না।
ল্যাবরেটরিতে শ্যাওলার কোষকলা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এমন কিছু ডিএনএ খুঁজে পান, যা মাইকোরাইজাল ছত্রাকের উপস্থিতিরই পূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এই ধরনের ছত্রাক সাধারণত কোনো উদ্ভিদ সঙ্গী ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে না। আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, মরুভূমির শ্যাওলায় পাওয়া ছত্রাক এবং অপেক্ষাকৃত কম শুষ্ক অঞ্চলের শ্যাওলায় পাওয়া ছত্রাক এক নয়। গবেষকদের ধারণা, নির্দিষ্ট কিছু ছত্রাক হয়তো শ্যাওলাকে অতিরিক্ত তাপ, খরা ও পরিবেশগত চাপ মোকাবিলায় সাহায্য করে।
এছাড়া শ্যাওলার ভেতরে পাওয়া ছত্রাকের প্রজাতি আশপাশের মাটিতে পাওয়া ছত্রাকের সঙ্গেও মিলছিল না। ফলে এটি কেবল বাইরের দূষণ বা আকস্মিক উপস্থিতি নয়, বরং একটি নির্বাচিত ও স্থায়ী সম্পর্ক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
এক্ষেত্রে ডিএনএ প্রমাণ যথেষ্ট ছিল না। তাই কিয়ান কেলি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে শ্যাওলার কোষ পর্যবেক্ষণ করেন। বিশেষ এক নীল রঞ্জক দিয়ে ছত্রাককে দৃশ্যমান করার পর তিনি যা দেখতে পান, তা গবেষণার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
শ্যাওলার কোষের ভেতরে দেখা যায় শাখা-প্রশাখাযুক্ত সূক্ষ্ম কাঠামো, যা দেখতে অনেকটা গাছের মতো। এগুলো অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল আরবাসকুল নামের সেই কাঠামোর সঙ্গে, যা সাধারণত উদ্ভিদের শিকড়ের ভেতরে তৈরি হয় এবং উদ্ভিদ ও ছত্রাকের মধ্যে পুষ্টি বিনিময়ের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
কিন্তু এখানেই তো আসল চমক। শ্যাওলার কোনো প্রকৃত শিকড় নেই। তবু একই ধরনের কাঠামো পাওয়া গেছে এর পাতার কোষে।
এর থেকে বোঝা যায় যে, শ্যাওলা ও ছত্রাকের মধ্যে হয়তো এমন এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যা আধুনিক উদ্ভিদ-ছত্রাক সহাবস্থানের আদিম রূপ হতে পারে।
বিবর্তনীয় ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব অপরিসীম। শ্যাওলা পৃথিবীর প্রাচীনতম স্থলজ উদ্ভিদগোষ্ঠীর উত্তরসূরি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় ৪৭০ মিলিয়ন বছর আগে যখন উদ্ভিদ প্রথমবারের মতো সমুদ্র ছেড়ে স্থলভাগে বসতি স্থাপন করেছিল, তখন প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য ছত্রাকের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। যদি শ্যাওলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সম্পর্কের প্রমাণ মেলে, তবে এটি হবে সেই প্রাচীন বিবর্তনী অংশীদারিত্বের জীবন্ত নিদর্শন। এর মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর স্থলজ জীবনের সূচনাকালকে নতুনভাবে দেখতে পারব। মাটির স্থিতিশীলতা রক্ষা, আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে মরুভূমির শ্যাওলার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং মানবসৃষ্ট বিঘ্নের কারণে এসব জীব সম্প্রদায় দ্রুত হুমকির মুখে পড়ছে।
যদি ভবিষ্যতে প্রমাণিত হয় যে ছত্রাক শ্যাওলাকে খরা ও তাপপ্রবাহ সহ্য করতে সাহায্য করে, তাহলে এই জ্ঞান মরুভূমির ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার নতুন কৌশল উদ্ভাবনে সহায়ক হতে চলেছে।
সূত্র: Scientists just found something weird inside moss – an unexpected fungal roommate By Linda Stewart, 18th June 2026, published in New Phytologist.
