অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার ও শিশুদের আচরণ 

অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার ও শিশুদের আচরণ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২ জুলাই, ২০২৬

একটি শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছর মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়েই গড়ে ওঠে তাদের খাদ্যাভ্যাস, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এবং সামাজিক আচরণের ভিত্তি। কানাডার গবেষকদের একটি নতুন গবেষণা দেখিয়েছে যে, প্রাক্-প্রাথমিক (প্রিস্কুল) বয়সী শিশুদের খাদ্যতালিকায় অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিমাণ বেশি হলে পরবর্তী বছরগুলোতে তাদের মধ্যে আচরণগত ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানী অধ্যাপক কোজেটা মিলিকু এবং তাঁর সহকর্মীরা। এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক জার্নাল জামা নেটওয়ার্ক ওপেন-এ। এটি এ ধরনের এক প্রথম বৃহৎ গবেষণা। এখানে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস ও পরবর্তী আচরণগত পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় কানাডার বহুদিনের CHILD Cohort Study-এর তথ্য ব্যবহার করা হয়। এতে ২,০০০-এরও বেশি শিশুর খাদ্যাভ্যাস তিন বছর বয়সে মূল্যায়ন করা হয় এবং পাঁচ বছর বয়সে তাদের মানসিক ও আচরণগত অবস্থা পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা শিশুদের আচরণ পরিমাপের জন্য বহুল ব্যবহৃত “Child Behavior Checklist” নামের একটি বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করেন।

এর ফলাফলে দেখা যায়, খাদ্য থেকে প্রাপ্ত মোট ক্যালোরির মধ্যে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের অংশ প্রতি ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ, ভয়, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা, আক্রমণাত্মক আচরণ এবং অতি চঞ্চলতার মতো সমস্যার স্কোর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অর্থাৎ, যত বেশি এই ধরনের খাবার খাওয়া হয়েছে, তত বেশি আচরণগত ও আবেগগত বিপত্তির লক্ষণ দেখা গেছে।

অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার বলতে সাধারণত এমন শিল্পজাত খাদ্যকে বোঝায়, যা পরিশোধিত উপাদান, কৃত্রিম স্বাদ, রং, সংরক্ষণকারী এবং বিভিন্ন সংযোজক পদার্থ দিয়ে তৈরি হয়। যেমন চিনিযুক্ত পানীয়, কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত পানীয়, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, প্যাকেটজাত ম্যাকারনি অ্যান্ড চিজ, প্রস্তুত-খাবার বা গরম করে খাওয়া যায় এমন বিভিন্ন খাদ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে এসব খাদ্যশ্রেণির সঙ্গে আচরণগত সমস্যার সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি।

গবেষকরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ করেন। তারা হিসাব করে দেখেন, যদি খাদ্যের ১০ শতাংশ ক্যালোরি অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে ফল, শাকসবজি এবং অন্যান্য স্বল্প-প্রক্রিয়াজাত বা প্রাকৃতিক খাবার থেকে আসে, তাহলে শিশুদের আচরণগত সমস্যার স্কোর কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়। এটি ইঙ্গিত করে যে খাদ্যাভ্যাসে তুলনামূলক ছোট পরিবর্তনও শিশুদের মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে গবেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই গবেষণা কিন্তু সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক প্রমাণ করে না। অর্থাৎ, একমাত্র অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের জন্যই যে এসব আচরণগত সমস্যা সৃষ্টি করছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক অবস্থা, ঘুম, শারীরিক কার্যকলাপ এবং অন্যান্য নানা বিষয়ও শিশুর আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। তবুও গবেষণাটি খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক বিকাশের মধ্যে একটি দৃঢ় সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।

অধ্যাপক মিলিকু মনে করেন, শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্য সহজলভ্য করা এবং অভিভাবকদের সঠিক পুষ্টি-পরামর্শ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মতে, সব পরিবার সমানভাবে তাজা ও প্রাকৃতিক খাবার পাওয়ার সুযোগ পায় না; কারণ অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার সাধারণত সস্তা, সহজলভ্য এবং সময় বাঁচায়। তাই বাস্তবসম্মত উপায়ে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর বিকল্প বাড়ানোই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে।

শৈশবের খাদ্যাভ্যাস শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যের নয়, মানসিক ও আচরণগত বিকাশের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

 

সূত্র : “Ultraprocessed Food Consumption and Behavioral Outcomes in Canadian Children” by Meaghan E. Kavanagh, Zheng Hao Chen, Sukhpreet K. Tamana, Theo J. Moraes, Elinor Simons, Stuart E. Turvey, Padmaja Subbarao, Piushkumar J. Mandhane and Kozeta Miliku, 3 March 2026, JAMA Network Open.

DOI: 10.1001/jamanetworkopen.2026.0434

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 + 10 =