ভূমধ্যসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে স্পার্ম তিমি নিয়ে গবেষণা করেন যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োঅ্যাকুস্টিশিয়ান টেইলর হার্শ এবং সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী লুক রেনডেল। তাঁরা দেখেন, এই অঞ্চলের সব স্পার্ম তিমি একই ধরনের শব্দ বা ‘উপভাষা’ ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে নতুন কৃষ্টিগত পরিবর্তন ঘটছে। গত দু দশক ধরে সংগৃহীত জলের গভীর তলের শব্দর রেকর্ড তাঁরা বিশ্লেষণ করেন। এই বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ভূমধ্যসাগরের পূর্ব ও পশ্চিম অংশ নিবাসী স্পার্ম তিমিদের ডাক বা শব্দ ব্যবহারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গ্রিসের উপকূলবর্তী হেলেনিক ট্রেঞ্চ অঞ্চলের স্পার্ম তিমিরা তাদের ঐতিহ্যবাহী শব্দের ছন্দে পরিবর্তন আনছে। তারা ‘কোডা’ সংকেত নামে পরিচিত ক্লিক-ক্লিক শব্দ ব্যবহার করে যোগাযোগ করে। সাধারণত সংকেতগুলো চারটি ক্লিকের সমন্বয়ে গঠিত। আর পূর্বাঞ্চলের তিমিরা এখন আগের তুলনায় অনেক দ্রুত গতিতে এই ক্লিকগুলো উচ্চারণ করছে। শব্দের মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রয়েছে, তবু ছন্দ ও গতি বদলে যাওয়ায় তা একটি নতুন ধরনের উপভাষার রূপ নিচ্ছে। এই পরিবর্তন থেকে বোঝা যায় বিচ্ছিন্ন প্রাণীগোষ্ঠীর মধ্যে কীভাবে নতুন কৃষ্টিগত পরিচয় গড়ে উঠতে পারে। পূর্বাঞ্চলের স্পার্ম তিমিরা দ্রুতগতির কোডা ব্যবহার করতে বেশি পছন্দ করে। মানুষের কানে এই শব্দগুলো অনেক সময় ঝাপসা বা দ্রুত মিশ্রিত মনে হতে পারে। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলের তিমিরা তুলনামূলক ধীর এবং স্পষ্ট ছন্দে যোগাযোগ করে। ফলে দুই অঞ্চলের তিমিদের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে এটাও লক্ষ্য করা গেছে, পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অঞ্চলের তিমিরা মাঝে মাঝে পুরোনো বা প্রচলিত কোডাও ব্যবহার করে। অর্থাৎ তারা পুরোপুরি আলাদা হয়ে যায়নি। বরং বিভিন্ন দলের মধ্যে এখনও কিছু কৃষ্টিগত আদান-প্রদান চলছে। ফলত নতুন উপভাষার বিকাশ ঘটলেও পুরোনো যোগাযোগ পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রয়েছে। মানুষের ভাষার মতোই তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থাও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত ও বিকশিত হতে পারে। নতুন প্রজন্ম পুরোনো ধারা অনুসরণ করার পাশাপাশি নতুন বৈশিষ্ট্যও যুক্ত করছে, যা একটি সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বর্তমানে স্পার্ম তিমিরা বিপন্ন প্রাণী হিসেবে বিবেচিত। তাদের সংখ্যা সীমিত এবং নানা পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাই গবেষকরা মনে করেন, এই প্রাণীদের সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। কারণ তাদের অনন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ক্রমবর্ধমান ‘শব্দভাণ্ডার’ শুধু সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানের জন্য নয়, প্রাণীদের সামাজিক ও কৃষ্টিগত বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: ScienceAlert, June; 2026
