জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি একটি ধূমকেতুর সন্ধান পেয়েছেন। এটি আমাদের সৌরজগতের যেকোনো পরিচিত বস্তু থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। 3I/ATLAS নামের এই আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতুটি আসলে অন্য একটি নক্ষত্রমণ্ডল থেকে এসেছে এবং এর বয়স হতে পারে প্রায় ১২০০ কোটি বছর। অর্থাৎ এটি আমাদের সৌরজগতের (প্রায় ৪৬০ কোটি বছর) চেয়ে পুরোনো তো বটেই, উপরন্তু মহাবিশ্বের জন্মের মাত্র কয়েক বিলিয়ন বছর পরেই এটি গঠিত হয়েছিল।
ধূমকেতুটি প্রথম শনাক্ত করা হয় ATLAS জরিপ প্রকল্পের মাধ্যমে। পরে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে এটি ঘণ্টায় প্রায় ২ লাখ ২১ হাজার কিলোমিটার বেগে সৌরজগৎ অতিক্রম করছে। এর ব্যাস প্রায় ২.৬ কিলোমিটার, যা পূর্বে আবিষ্কৃত দুই আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু—‘ওউমুয়ামুয়া (২০১৭) এবং বোরিসভ (২০১৯)—এর তুলনায় অনেক বড় ও উজ্জ্বল।
এই উজ্জ্বলতাই গবেষকদের জন্য একটি বড় সুযোগ এনে দেয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিজ্ঞানীরা জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) ব্যবহার করে ধূমকেতুটির রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করেন। ধূমকেতুর চারপাশের গ্যাসীয় আবরণ থেকে নির্গত অবলোহিত আলো বিশ্লেষণ করে তারা এর রাসায়নিক স্বাক্ষর নির্ধারণ করেন।
দেখা যায়, ধূমকেতুটিতে জলীয় বাষ্প, কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, এমনকি নিকেল ও লোহা প্রভৃতি ধাতব উপাদানও রয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আসে কার্বন ও হাইড্রোজেনের আইসোটোপ বিশ্লেষণ থেকে।
3I/ATLAS-এ কার্বন-১২-এর তুলনায় কার্বন-১৩-এর পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কম। মহাবিশ্বে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে কার্বন-১৩ তৈরি হয়। ফলে কার্বন-১৩-এর স্বল্পতা ইঙ্গিত দেয় যে ধূমকেতুটি এমন এক যুগে গঠিত হয়েছিল, যখন মহাবিশ্বে তুলনামূলকভাবে কম নক্ষত্র বিস্ফোরিত হয়েছিল।
এছাড়া এতে অর্ধ-ভারী জল প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেছে। এই ধরনের জল সাধারণত উচ্চ বিকিরণযুক্ত, ঠান্ডা ও বিশাল তারা গঠন অঞ্চলে বেশি তৈরি হয়। এই পরিবেশ মহাবিশ্বের প্রাচীন যুগে খুব সাধারণ ছিল।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে মহাবিশ্বের জন্মের মাত্র ২০০ কোটি বছরের মধ্যেই গ্রহ গঠনের উপাদান তৈরি হতে শুরু করেছিল। এত পুরোনো নক্ষত্রমণ্ডলের ক্ষুদ্র বস্তু সরাসরি দেখা সম্ভব হয় না, তাই 3I/ATLAS-এর মতো আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতুগুলোই সেই হারিয়ে যাওয়া যুগের একমাত্র প্রত্যক্ষ সাক্ষী। বর্তমানে মাত্র তিনটি আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু শনাক্ত হয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাদের সৌরজগতের মধ্য দিয়ে এমন অসংখ্য বস্তু নিয়মিত অতিক্রম করে। আগামী দশকে Vera C. Rubin Observatory এবং নাসার নতুন পর্যবেক্ষণ প্রকল্পগুলো চালু হলে আরও বহু আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতু আবিষ্কৃত হতে পারে।
3I/ATLAS ধূমকেতুটি মহাবিশ্বের সুদূর অতীত থেকে আসা এক মহাজাগতিক বার্তাবাহক। এটি আমাদের জানান দেয় গ্রহ, নক্ষত্র এবং সম্ভবত জীবনের উপযোগী জগতের জন্ম কেমন পরিবেশে হয়েছিল। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা অন্য নক্ষত্রমণ্ডলগুলোর প্রকৃতি সম্পর্কে নতুন ধারণা পাচ্ছেন এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধানের পথ খুলে যাচ্ছে।
সূত্র: doi: 10.1126/science.zhcbpte
