টার্ডিগ্রেড কায়দার ফায়দা তুলবে মানুষ 

টার্ডিগ্রেড কায়দার ফায়দা তুলবে মানুষ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৪ জুলাই, ২০২৬

টার্ডিগ্রেড বা ওয়াটার বিয়ার প্রকৃতির সবচেয়ে সহনশীল প্রাণীগুলোর মধ্যে অন্যতম । অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া দেখা যায় না এই অতি ক্ষুদ্র প্রাণী গুলিকে। এরা এমন সব প্রতিকূল পরিবেশেও বেঁচে থাকতে পারে, যেখানে অধিকাংশ জীবের অস্তিত্ব মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যায়। প্রচণ্ড খরা, পরম শূন্যের কাছাকাছি হিমশীতল তাপমাত্রা, ফুটন্ত গরম, তীব্র বিকিরণ, এমনকি মহাকাশের বায়ুশূন্য পরিবেশেও এই টার্ডিগ্রেডরা টিকে থাকতে সক্ষম। এই অসাধারণ ক্ষমতার রহস্য লুকিয়ে আছে তাদের বায়োস্ট্যাসিস বা ক্রিপ্টোবায়োসিস নামের এক বিশেষ অবস্থায়। প্রতিকূল পরিবেশে টার্ডিগ্রেড প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিজের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) থামিয়ে দেয়। ফলে শরীরের সমস্ত কার্যকলাপ প্রায় থেমে যায়। তারা বছরের পর বছর, এমনকি কয়েক দশক পর্যন্ত এই নিষ্ক্রিয় অবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে। পরিবেশ আবার অনুকূল হলে তারা স্বাভাবিকভাবে জেগে ওঠে এবং জীবনযাত্রা শুরু করে।

সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব ওয়াইওমিং-এর গবেষকেরা এই রহস্যময় বিস্ময়কর ক্ষমতা মানুষের কোষে প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। তারা টার্ডিগ্রেডের CAHS D (সাইটোপ্লাসমিক আবান্ডান্ট হিট সলিউবল ডি) নামের একটি বিশেষ প্রোটিন মানুষের কিডনিকোষে প্রবেশ করান। এই প্রোটিন টার্ডিগ্রেডের দেহে চাপের সময় কোষের ভেতরে জেল সদৃশ একটি সুরক্ষা স্তর তৈরি করে, যা কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে।

গবেষণায় দেখা যায়, মানব কোষেও এই প্রোটিন ওই একই ধরনের আচরণ করে। প্রতিকূল পরিবেশে এটি কোষের ভেতরে জেল সদৃশ গঠন তৈরি করে, যার ফলে কোষের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং গুরুত্বপূর্ণ অণু ও কোষ কাঠামো সুরক্ষিত থাকে। এর ফলে মানবকোষও শুষ্কতা ও অন্যান্য পরিবেশগত চাপ অনেক বেশি সহ্য করতে পারে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, এই পরিবর্তনটিকে সম্পূর্ণ উল্টো পথেও চালনা করা সম্ভব। অর্থাৎ চাপের প্রভাব কমে গেলে জেল-সদৃশ গঠনটি ভেঙে যায় এবং কোষ আবার স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়া শুরু করে দেয়। এতে কোষের দীর্ঘমেয়াদি কোনো ক্ষতি দেখা যায়নি।

এই আবিষ্কার ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জৈবপ্রযুক্তিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে শীততাপ নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কোষ, কোষকলা বা এমনকি অঙ্গ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে। এতে দুর্গম অঞ্চলে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে, মহাকাশ অভিযানের মতো ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি কোষের বুড়িয়ে যাওয়ার গতি কমানো, পরিবেশগত চাপ সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ানো এবং বিভিন্ন ওষুধকে দীর্ঘদিন স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

প্রকৃতির এক ক্ষুদ্র প্রাণীর কোটি বছরের অভিযোজন কৌশলকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন মানুষের চিকিৎসা ও জীববিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পথে এগিয়ে চলেছেন।

সূত্র: University of Wyoming research published in Protein Science, reported via ScienceAlert and UW News.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one + five =