সম্প্রতি একটি লজ্জাজনক ঘটনা ইতিহাসবিদদের নজরে এসেছে। বিশ্বখ্যাত জার্মান পদার্থবিদ এবং কোয়ান্টাম তত্ত্বের জনক ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের দুটি গবেষণাপত্র হঠাৎ করেই বৈজ্ঞানিক রচনাদি থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ১৯১৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারজয়ী এই জার্মান বিজ্ঞানী তাঁর ব্যক্তিগত সততা ও নৈতিক দৃঢ়তার জন্য সারা বিশ্ববাসীর কাছে সম্মানিত। অথচ মৃত্যুর প্রায় আট দশক পরে তাঁর দুটি গবেষণাপত্র হঠাৎ করেই বৈজ্ঞানিক রচনাদি থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কেন হল এরকম? সেই ঘটনাকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে চরম বিতর্ক। শোনা গেছে, ২০১১ সালে স্প্রিঙ্গার নেচারের প্রকাশক চুপিসারে এই দুটি প্রবন্ধ প্রত্যাহার করেছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এই গুরুতর বিষয়টি এতদিন কারোর নজরে আসেনি। এখন সব জানাজানি হওয়ার পর সবার একটাই জিজ্ঞাস্য: এটি কি সত্যিই কপিরাইট লঙ্ঘনের ঘটনা, নাকি প্রকাশকের স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের একটি বড় ভুল?
ঘটনাটি সামনে আসে যখন কানাডার মন্ট্রিয়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ ইভ গিংরাস রিট্রাকশান ওয়াচে নোবেলজয়ীদের প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রের তালিকা দেখতে গিয়ে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের নাম দেখতে পান। তাঁর মতে, প্ল্যাঙ্কের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের গবেষণা জালিয়াতি বা অসদাচরণের অভিযোগ ইতিহাসে কখনও শোনা যায়নি। বরং বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে মৌলিক অবদানের পাশাপাশি তাঁর তিনি বৈজ্ঞানিক সততা ও ব্যক্তিত্বের জন্য সমানভাবে সম্মানিত ছিলেন। এছাড়াও, নাৎসি জার্মানির ইহুদিবিরোধী নীতির বিরুদ্ধেও তিনি প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন।
তদন্তে জানা যায়, ১৯৪২ সালে প্রকাশিত প্ল্যাঙ্কের একটি দার্শনিক প্রবন্ধ “Sinn und Grenzen der exakten Wissenschaft” / ‘নির্ভুল বিজ্ঞানের অর্থ ও সীমা’ পরে আরও কয়েকটি পত্রিকাতে ও বইয়ে পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। বর্তমান প্রকাশনা নীতি অনুযায়ী একই লেখা একাধিক স্থানে প্রকাশ করাকে স্ব-চৌর্য বা কপিরাইট লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই কারণেই নেচার পত্রিকাটি এই প্রবন্ধটি প্রত্যাহার করেছে বলে উল্লেখ করেছে।
কিন্তু ইতিহাসবিদদের মতে, আজকের মানদণ্ড অতীতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া খুবই অনুচিত কাজ। ইন্টারনেটের আগের যুগে একই লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ করা ছিল খুবই সাধারণ বিষয়। কারণ এর একটাই উদ্দেশ্য – বিভিন্ন দেশের ও বিভিন্ন পাঠকগোষ্ঠীর কাছে গবেষণার ধারণা পৌঁছে দেওয়া। শুধু প্ল্যাঙ্ক নন, আলবার্ট আইনস্টাইনসহ বহু খ্যাতনামা বিজ্ঞানীও একই কাজ করেছিলেন। গিংরাস ও তাঁর সহকর্মী মাহদি খেলফাউইর মতে, আধুনিক প্রকাশনা নীতি ১৯৪০-এর দশকের লেখার ওপর প্রয়োগ করা ইতিহাসকে বিকৃত করার শামিল। আরও লজ্জার বিষয় হলো, প্ল্যাঙ্ক ১৯৪৭ সালে মারা যাওয়ায় তাঁর অধিকাংশ রচনা এখন কপিরাইটমুক্ত ।
বিতর্কটা মূলত আরও গভীর হয় দ্বিতীয় প্রত্যাহার হওয়া প্রবন্ধটি নিয়ে। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত এই লেখাটি আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। এখন কথা হচ্ছে তাহলে সেটি কেন প্রত্যাহার করা হলো?
ইতিহাসবিদ মাহদি খেলফাউই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র খুঁজে পান। প্ল্যাঙ্কের প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল “Naturwissenschaft und reale Außenwelt”/’প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও বাস্তব বহির্জগৎ’। ঠিক এক মাস আগে একই জার্নালে দার্শনিক অ্যালোইস মূলার একই শিরোনামে একটি ভিন্ন প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ আলাদা হলেও একই শিরোনাম থাকার কারণে প্রকাশকের স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার সেটিকে ভুল করে নকল বা কপিরাইট লঙ্ঘন হিসেবে শনাক্ত করে থাকতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা।
আরও চমকের বিষয় হলো, সাধারণত প্রত্যাহার করা গবেষণাপত্রের মূল লেখা সংরক্ষিত থাকে এবং তার ওপর শুধু প্রত্যহারের চিহ্ন বসানো হয়, যাতে গবেষকরা ঐতিহাসিক নথি হিসেবে সেটি পড়তে পারেন। কিন্তু প্ল্যাঙ্কের ক্ষেত্রে পুরো প্রবন্ধই সরিয়ে ফেলে একটি ফাঁকা পৃষ্ঠা রেখে দেওয়া হয়, যেখানে শুধু লেখা ছিল যে নিবন্ধটি নীতিমালা লঙ্ঘনের কারণে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আবার এতদিন সেই ফাঁকা PDF-ও অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করা হচ্ছিল।
বর্তমানে দ্য সায়েন্স অফ নেচারের সম্পাদক সুজান স্কারলাটা এই ঘটনাকে অবিশ্বাস্য বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর ধারণা, মানুষের পর্যালোচনা ছাড়াই কোনো স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদম এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে নেচার বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে।
গিংরাস ও খেলফাউইর আশঙ্কা, যদি সত্যিই একটি অ্যালগরিদমের ভুলের কারণে প্ল্যাঙ্কের মতো একজন কিংবদন্তি বিজ্ঞানীর গবেষণাপত্র হারিয়ে যেতে পারে, তাহলে আরও অনেক কম পরিচিত বিজ্ঞানীর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাও একইভাবে বৈজ্ঞানিক ইতিহাস থেকে মুছে যেতে পারে। তাঁদের দাবি, প্ল্যাঙ্কের দুটি প্রবন্ধ দ্রুত পুনর্বহাল করা উচিত। কারণ, ইতিহাসকে সংরক্ষণ করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রযুক্তির ভুলের কারণে সেই ইতিহাস বিকৃত হওয়াও সমানভাবে উদ্বেগের বিষয়।
সূত্র: doi: 10.1126/science.zwsaifa
