মঙ্গলের নদীতীরে জৈব কার্বনের সন্ধান 

মঙ্গলের নদীতীরে জৈব কার্বনের সন্ধান 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৭ জুলাই, ২০২৬

একসময় মঙ্গলের বুক বেয়ে বইত নদী, ছিল হ্রদও। সেই জলসমৃদ্ধ অতীতেই কি জন্ম নিয়েছিল প্রাণ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই নাসার পারসিভিয়ারেন্স রোভার গত কয়েক বছর ধরে মঙ্গলের জেজিরো গহ্বরের প্রাচীন নদীখাতে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রোভারটি ব্রাইট এঞ্জেল নামের একটি শিলাস্তরে সম্ভাব্য জৈবরাসায়নিক স্বাক্ষর শনাক্ত করেছিল। এবার সেই একই শিলায় মিলল জৈব কার্বনের উপস্থিতি। গবেষকদের মতে, এটি মঙ্গলের অতীতের বাসযোগ্য পরিবেশ সম্পর্কে এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলোর একটি।

সায়েন্স অ্যাডভান্সেসে প্রকাশিত নতুন গবেষণায় জানানো হয়েছে, পারসিভিয়ারেন্সের সঙ্গে থাকা SHERLOC (Scanning Habitable Environments with Raman & Luminescence for Organics and Chemicals) যন্ত্রটি অতিবেগুনি লেজারের সাহায্যে শিলার অতি ক্ষুদ্র অংশ বিশ্লেষণ করে ম্যাক্রোমলিকুলার কার্বন (Macromolecular Carbon বা MMC) শনাক্ত করেছে। এটি এমন এক ধরনের বৃহৎ ও স্থিতিশীল কার্বন যৌগ, যা জীবন্ত প্রাণীর কার্যকলাপের মাধ্যমে তৈরি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে উল্কাপিণ্ড বা অন্যান্য প্রাকৃতিক অজৈব প্রক্রিয়াতেও এ ধরনের কার্বন সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এই আবিষ্কারকে প্রাণের সরাসরি প্রমাণ বলা না গেলেও, এটি অতীতের জৈব রসায়নের শক্তিশালী ইঙ্গিত বহন করে।

গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক অ্যাশলি মারফির ভাষায়, এই ম্যাক্রোমলিকুলার কার্বনের উৎপত্তি এখনও নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তবুও এটি মঙ্গল অনুসন্ধানের ইতিহাসে অন্যতম রোমাঞ্চকর আবিষ্কার, কারণ এটি ওই লাল গ্রহের অতীত পরিবেশ সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সুযোগ এনে দিয়েছে।

এই আবিষ্কারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, জৈব কার্বন শনাক্ত করতে পারসিভিয়ারেন্সকে শিলায় ড্রিলও করতে হয়নি। কার্বনটি মঙ্গলের পৃষ্ঠের মাত্র কয়েক মাইক্রোমিটার নীচেই অবস্থান করছিল। এটি বিস্ময়কর, কারণ মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত পাতলা হওয়ায় মহাজাগতিক বিকিরণ সরাসরি পৃষ্ঠে আঘাত হানে এবং দীর্ঘ সময়ে জটিল জৈব অণুগুলো সাধারণত ভেঙে যায়। গবেষকদের ধারণা, এই কার্বন হয় নিজেই বিকিরণ-সহনশীল, অথবা কাদামাটির মতো কোনো অজৈব খনিজের সূক্ষ্ম স্তর তাকে সুরক্ষা দিয়েছে।

এই আবিষ্কার আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে নাসার আরেক রোভার কিউরিওসিটি -র পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে। জেজিরো গহ্বর থেকে প্রায় ৩,২০০ কিলোমিটার দূরে গেল গহ্বরেও কিউরিওসিটি অতীতে বৃহৎ কার্বন অণুর সন্ধান পেয়েছিল। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের জৈব কার্বনের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, কয়েকশো কোটি বছর আগে মঙ্গলের নদী ও হ্রদ জুড়ে জৈব পদার্থ হয়তো বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে ছিল। অর্থাৎ, জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক রাসায়নিক উপাদান কোনো বিচ্ছিন্ন এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল অনেক ব্যাপক।

তবে বিজ্ঞানীরা এখনও সতর্ক। জৈব কার্বনের উপস্থিতি মানেই যে সেখানে একসময় প্রাণ ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনও আসেনি। কারণ জৈব অণু জীববৈজ্ঞানিক এবং অজৈব, উভয় প্রক্রিয়াতেই তৈরি হতে পারে। এই রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান মিলবে তখনই, যখন পারসিভিয়ারেন্স ও কিউরিওসিটির সংগ্রহ করা শিলা ও মাটির নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে অত্যাধুনিক পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। যদিও সেই Mars Sample Return কর্মসূচি প্রযুক্তিগত জটিলতা ও ব্যয়ের কারণে এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।

তবুও এই নতুন গবেষণা মঙ্গল অনুসন্ধানে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, আজকের শুষ্ক ও অনুর্বর লাল গ্রহ একসময় ছিল অনেক বেশি আর্দ্র, রাসায়নিকভাবে সক্রিয় এবং সম্ভবত জীবনের বিকাশের জন্য অনুকূল। প্রাণের সরাসরি প্রমাণ এখনও অধরা হলেও, মঙ্গলের প্রাচীন ইতিহাসের ধাঁধা সমাধানের পথে বিজ্ঞানীরা যে আরও এক ধাপ এগোলেন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

 

সূত্র : NASA/JPL-Caltech

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen − 12 =