কঙ্কাল সাফাইয়ের নতুন পদ্ধতি

কঙ্কাল সাফাইয়ের নতুন পদ্ধতি

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৯ জুলাই, ২০২৬

বৈজ্ঞানিক বস্তু হোক কিংবা প্রাগৈতিহাসিক, সংগ্রহশালায় সংরক্ষণের জন্য একটা প্রাণীর পরিষ্কার, অক্ষত এবং স্বাভাবিক গঠনযুক্ত কঙ্কালের গুরুত্ব অপরিসীম। গবেষণা, শিক্ষা এবং প্রদর্শনীর কাজে এসব কঙ্কাল ব্যবহার করা হয়। তবে কঙ্কাল প্রস্তুত করার প্রচলিত পদ্ধতিগুলো সময়সাপেক্ষ, দুর্গন্ধযুক্ত ও জীবাণুর ঝুঁকিপূর্ণ। যেমন পচন, বিভিন্ন রাসায়নিকের ব্যবহার অথবা ডারমেস্টিড বিটল/চামড়ার গুবরে পোকা বসতির সাহায্যে মাংস অপসারণ। অনেক সময় এসব ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম ও ভঙ্গুর হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গবেষকরা সুপারওয়ার্ম জোবোফোস মরিও নামক এক ধরনের পোকার লার্ভা ব্যবহার করে একটি নতুন জৈব পদ্ধতির কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছেন। এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে প্লস ওয়ানে।

গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের মেরুদণ্ডী প্রাণীর নমুনা ব্যবহার করা হয়। নমুনাগুলোকে ছোট, মাঝারি এবং বড়—এই তিনটি আকারে ভাগ করা হয়। পরীক্ষার আগে নমুনা থেকে বাইরের চামড়া ও বড় মাংসপেশি অপসারণ করা হয়, যাতে সুপারওয়ার্মগুলো সহজে অবশিষ্ট নরম কোষকলাগুলো খেয়ে ফেলতে পারে।

গবেষকরা প্রথমে একই আকারের পাত্রে প্রায় ৭০০ গ্রাম সুপারওয়ার্ম রেখে বিভিন্ন আকারের নমুনা পরিষ্কার করেন। এর মাধ্যমে তাঁরা লার্ভা ও নমুনার অনুপাতের প্রভাব মূল্যায়ন করেন। দেখা যায়, যদি লার্ভার সংখ্যা খুব বেশি হয়, তারা শুধু মাংসই নয়, অনেক সময় ভঙ্গুর হাড়কেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। আবার লার্ভার সংখ্যা খুব কম হলে কঙ্কাল পরিষ্কার হতে অনেক বেশি সময় লাগে।

একাধিক পরীক্ষার ভিত্তিতে গবেষকরা দেখিয়েছেন, প্রতি একক নমুনার জন্য ১০/১৫:১ লার্ভা/নমুনা অনুপাত সবচেয়ে কার্যকর। এই অনুপাতে পরিষ্কারের গতি ভালো থাকে এবং হাড়ের ক্ষতির ঝুঁকিও অত্যন্ত কম। পরবর্তীতে এই অনুপাত ব্যবহার করে বহু পাখির খুলির ওপর পরীক্ষা চালানো হলে দেখা যায়, সব নমুনাই সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়েছে এবং কোথাও কোনো হাড়ের ক্ষতি হয়নি।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নমুনার আকার অনুযায়ী সুপারওয়ার্ম কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই নরম কোষকলা সরিয়ে ফেলতে সক্ষম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা খুলির ভেতর বা মেরুদণ্ডের ফাঁকের মতো সংকীর্ণ ও জটিল অংশেও প্রবেশ করে টিস্যু পরিষ্কার করতে পারে, যা প্রচলিত পদ্ধতিতে অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ডারমেস্টিড বিটল বসতির তুলনায় সুপারওয়ার্ম ব্যবহারের আরও কিছু বিশেষ সুবিধা রয়েছে। গুবরে পোকার কলোনিতে ডিম, পিউপা ও পূর্ণবয়স্ক পোকাসহ একাধিক জীবনধাপ থাকে, ফলে ল্যাবরেটরি বা সংগ্রহশালায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। বিপরীতে, কঙ্কাল পরিষ্কারের কাজে ব্যবহৃত সুপারওয়ার্ম কেবল লার্ভা পর্যায়ে থাকে, তাই সংক্রমণ বা অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

গবেষকদের মতে, সুপারওয়ার্ম বাজারে সহজলভ্য এবং এদের বসতি রক্ষণাবেক্ষণও খুব সহজ। ফলে বড় গবেষণাগার থেকে শুরু করে ছোট সংগ্রহশালা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমির সংগ্রহশালাতেও এই পদ্ধতি সহজে ব্যবহার করা সম্ভব।

এক কথায় , সুপারওয়ার্ম-ভিত্তিক কঙ্কাল পরিষ্কার পদ্ধতি দ্রুত, নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং হাড়ের গঠন অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর। ভবিষ্যতে এটি সংগ্রহশালা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং অ্যানাটমিক্যাল সংগ্রহশালায় প্রচলিত পরিষ্কার কঙ্কাল সজ্জা প্রক্রিয়ার একটি নির্ভরযোগ্য ও আধুনিক বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে আশা করা যায়।

 

সূত্র: Rastekar F, Alaei Kakhki N, Aliabadian M, Monfared M (2026) A practical and safe alternative method for skeletal cleaning for museum specimens using superworms (Zophobas morio). PLoS One 21(7): e0349669. doi:10.1371/journal.pone.0349669

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 3 =