সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দুটি বহির্গ্রহ আবিষ্কার করেছেন। তারা আকারে প্রায় বৃহস্পতির সমান হলেও ঘনত্ব এতটাই কম যে এগুলোকে কার্যত ‘গ্রহ-আকৃতির মেঘ’ বলা যায়। TOI-791 b এবং TOI-791 c নামের এই দুই গ্রহের ঘনত্ব প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে মাত্র ০.০৪ গ্রাম, যা বৃহস্পতির তুলনায় প্রায় ৩০ গুণ কম। তুলনা করলে বলা যায়, ওজনের দিক থেকে এগুলো হাওয়াই মিঠার (ক্যান্ডি ফ্লস)-এর চেয়েও হালকা।
এই দুটি গ্রহ পৃথিবী থেকে প্রায় ১,১১০ আলোকবর্ষ দূরে ভোলান্স নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এগুলোর সন্ধান পেয়েছেন পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নন, নাসার TESS মিশনের তথ্য বিশ্লেষণে যুক্ত বিজ্ঞানীরা।
গ্রহ দুটি শনাক্ত করা হয় পরিবহন/ অতিক্রমণ পদ্ধতিতে। সাধারণত কোনো গ্রহ তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে অতিক্রম করলে নক্ষত্রের আলো সামান্য কমে যায়। সেই ক্ষীণ আলোর পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেই গ্রহের আকার নির্ণয় করা সম্ভব হয়। TOI-791 b এবং TOI-791 c-এর প্রতিটি পরিবহন ১১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে। এত দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ একটানা সম্পন্ন করার জন্য অ্যান্টার্কটিকার একটি বিশেষ দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এটি মেরুর দীর্ঘ শীতল টানা অন্ধকারেও নিরবচ্ছিন্নভাবে আকাশ পর্যবেক্ষণে সক্ষম।
গ্রহ দুটির ভর নির্ধারণ করা হয়েছে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম কৌশলে। তারা ৫:৩ কক্ষীয় অনুরণনে আবদ্ধ। অর্থাৎ, ভেতরের গ্রহটি নক্ষত্রকে পাঁচবার প্রদক্ষিণ করার সময় বাইরের গ্রহটি প্রায় ঠিক তিনবার প্রদক্ষিণ করে। এই বিশেষ কক্ষীয় সম্পর্কের কারণে তারা একে অপরের ওপর মহাকর্ষীয় টান সৃষ্টি করে, যার ফলে পরিবহনের সময়ে খুব সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে। বিজ্ঞানীরা এই ট্রানজিট টাইমিং ভ্যারিয়েশন বিশ্লেষণ করে গ্রহগুলোর ভর নির্ণয় করেছেন।
দেখা গেল, আয়তন বিশাল হলেও গ্রহ দুটির ভর অত্যন্ত কম। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এগুলো মূলত বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাসে আবৃত। সম্ভবত একটি ছোট পাথুরে কেন্দ্রকে ঘিরে এই বিশাল গ্যাসীয় আবরণ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলো, গ্রহ দুটি তাদের নক্ষত্র থেকে অনেক দূরে, অপেক্ষাকৃত শীতল অঞ্চলে গঠিত হয়েছিল। সেখানে সহজেই বিপুল পরিমাণ গ্যাস জমা করতে পেরেছিল। পরে বিভিন্ন মহাকর্ষীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে বর্তমান কক্ষপথে, অর্থাৎ নক্ষত্রের কাছাকাছি চলে আসে।
এখন বিজ্ঞানীরা জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে এই দুই গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশদভাবে পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা করছেন। বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করা হবে, তাদের উৎপত্তি ও বিবর্তন সম্পর্কে বর্তমান তত্ত্ব কতটা সঠিক। একই নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, একই ধরনের উৎপত্তির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এত কম ঘনত্বের এই দুই গ্রহ কীভাবে গঠিত হলো, তা এখনো আধুনিক গ্রহবিজ্ঞানের অন্যতম বড় রহস্য। TOI-791 b এবং TOI-791 c নতুন দুটি বহির্গ্রহের পাশাপাশি জন্ম, গঠন ও বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সূত্র: TIMESOFINDIA.COM / Updated: Jun 28, 2026, 07:13 IST
