বিজ্ঞানে ডলির উত্তরাধিকার 

বিজ্ঞানে ডলির উত্তরাধিকার 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ জুলাই, ২০২৬

গবেষণাগারে তার পরিচয় ছিল 6LL3। ১৯৯৬ সালের ৫ জুলাই স্কটল্যান্ডের এডিনবরার রসলিন ইনস্টিটিউটে ভূমিষ্ঠ ডলি ওরফে 6LL3 ছিল বিশ্বের প্রথম স্তন্যপায়ী প্রাণী, যাকে একটি পূর্ণবয়স্ক প্রাণীর দেহকোষ থেকে সফলভাবে ক্লোন করা হয়েছিল। এই ঘটনা জীববিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং নৈতিকতার জগতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। অধ্যাপক ইয়ান উইলমাট ও প্রফেসর কিথ ক্যাম্পবেল-এর নেতৃত্বে গবেষকরা যুক্তরাজ্যে উদ্ভূত গৃহপালিত ভেড়ার একটি বিশেষ জাত, ফিন ডরসেট ভেড়া নিয়ে কাজ করেন। এহেন একটি পূর্ণবয়স্ক ভেড়ার স্তনগ্রন্থি কোষের নিউক্লিয়াস তাঁরা একটি নিউক্লিয়াসমুক্ত ডিম্বাণুতে প্রতিস্থাপন করেন। পরে সেই ভ্রূণ অন্য এক মায়ের গর্ভে স্থাপন করা হলে জন্ম হয় ডলির। স্তনগ্রন্থির কোষ থেকে তৈরি হওয়ায় স্বাস্থ্যবতী মার্কিন গায়িকা ডলি পার্টন-এর নামে তার নাম রাখা হয়। ডলির জন্মের খবর কয়েক মাস গোপন রাখা হয়। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা প্রকাশ্যে আসতেই বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অনেক বিজ্ঞানী প্রথমে বিশ্বাসই করতে চাননি, পূর্ণবয়স্ক দেহকোষ থেকে ক্লোন তৈরি করা সম্ভব। একই সঙ্গে মানব ক্লোনিং নিয়ে তীব্র নৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন মানব ক্লোনিং গবেষণায় সরকারি অর্থায়ন সীমিত করার আহ্বান জানান। রসলিন ইনস্টিটিউট অবশ্য স্পষ্ট করে জানায়, তাদের লক্ষ্য মানুষের ক্লোন তৈরি নয়, রোগের কারণ বোঝা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়নে এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো। বর্তমানে সেখানে আর ক্লোনিং গবেষণা হয় না। ডলির পর ঘোড়া, গরু, কুকুর ও বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর ক্লোন তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথম ক্লোন কুকুর স্নাপি এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ক্লোন বিড়াল সিসি (কপিক্যাট) তৈরি হয়। পরে ভায়াজেন পেটস নামের একটি সংস্থা বাণিজ্যিকভাবে পোষ্য প্রাণী ক্লোন করার পরিষেবা চালু করে। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, জিন একই হলেও পরিবেশ ও বেড়ে ওঠার পার্থক্যের কারণে ক্লোন প্রাণীর স্বভাব বা আচরণ মূল প্রাণীর মতো নাও হতে পারে। ডলির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার ক্লোনিং প্রযুক্তি নয়, বরং স্টেম সেল গবেষণায় তার প্রভাব। জাপানের বিজ্ঞানী শিনিয়া ইয়ামানাকা ডলির গবেষণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পূর্ণবয়স্ক কোষকে আবার স্টেম সেলে রূপান্তরের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এই আবিষ্কারের জন্য তিনি ২০১২ সালে নোবেল পুরস্কার পান। বর্তমানে এই প্রযুক্তির ভূমিকা রোগ নিয়ে গবেষণা ও নতুন ওষুধ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, ছয় বছর বয়সে ফুসফুসের সংক্রমণ ও টিউমারের কারণে ডলির মৃত্যু হয়। প্রথমে অনেকে তার অকালমৃত্যুর জন্য ক্লোনিংকে দায়ী করলেও এর কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আজ ডলির সংরক্ষিত দেহ স্কটল্যান্ডের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব স্কটল্যান্ডে প্রদর্শিত হচ্ছে। সামান্য একটি ভেড়া যে আধুনিক জীববিজ্ঞানের গতিপথ বদলে দিতে পারে, ডলির বৃত্তান্ত তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

 

সূত্র: Metro; July 5, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 3 =