হাবলকে বাঁচানোর লড়াই 

হাবলকে বাঁচানোর লড়াই 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ জুলাই, ২০২৬

১৯৯০ সালে উৎক্ষেপণের পর থেকে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসের পাশাপাশি, মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টে দিয়েছে। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি অসংখ্য পথ নির্দেশকারী আবিষ্কার করেছে। কিন্তু এখন হাবলের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। নাসার একটি বিশেষ কর্মদল বিবেচনা করছে, টেলিস্কোপটিকে আরও উঁচু ও স্থিতিশীল কক্ষপথে তুলে ২০৩০-এর দশক পর্যন্ত চালু রাখা হবে, তারপর একটি রোবোটিক অভিযানের মাধ্যমে নিরাপদে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ফিরিয়ে এনে সমুদ্রে অবতরণ করানো হবে।

এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিজ্ঞানীরা হাবলের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ঝুঁকি এবং ব্যয়ের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছেন। অনেক গবেষক মনে করেন প্রযুক্তিগতভাবে হাবলকে যতদিন সম্ভব ততদিন সচল রাখা উচিত। তাঁদের মতে, এটি এখনও এমন বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম, যা অন্য কোনো মহাকাশ দূরবীন পুরোপুরি দিতে পারে না।

হাবলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি অতিবেগুনি ও দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এই তথ্য ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা ছায়াপথ, নক্ষত্র ও গ্রহ কীভাবে সৃষ্ট ও বিবর্তিত হয়েছে, তা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন। অন্যদিকে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মূলত অবলোহিত আলোতে কাজ করে। ফলে দুটি দূরবীন একে অপরের পরিপূরক। একসঙ্গে তারা মহাবিশ্বের আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম।

হাবলের অবদান আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে অসামান্য। এটি মহাবিশ্বের গভীরতম দৃশ্য ধারণ করে দেখিয়েছে কীভাবে কোটি কোটি বছরে আমাদের ছায়াপথের পরিবর্তন ঘটেছে। দূরবর্তী সুপারনোভা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন যে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ক্রমশ দ্রুত হচ্ছে, যার পেছনে রহস্যময় ডার্ক এনার্জি কাজ করছে। এছাড়া হাবল প্রথমবারের মতো সৌরজগতের বাইরের একটি গ্রহের বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ করে এবং নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যুর বিস্ময়কর দৃশ্যও ধারণ করেছে।

হাবলের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষক এর তথ্য ব্যবহার করে নতুন নতুন গবেষণা করছেন। এখনও হাবলে পর্যবেক্ষণের জন্য যত আবেদন জমা পড়ে, তার তুলনায় সময়ের প্রাপ্যতা প্রায় ছয় গুণ কম। অর্থাৎ, এত বছর পরও এর চাহিদা একটুও কমেনি।

বিজ্ঞানীদের মতে, হাবলের উত্তরসূরি হ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস অবজারভেটরি ২০৪০ সালের আগে উৎক্ষেপণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই সেই সময় পর্যন্ত হাবল সচল থাকলে মহাকাশ গবেষণায় বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হবে না।

এই হাবল টেলিস্কোপটি মানুষের কৌতূহল, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং মহাবিশ্বকে জানার অবিরাম প্রচেষ্টার প্রতীক। তাই অনেক বিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেন, যতদিন সম্ভব হাবলকে সংরক্ষণ করে তার বৈজ্ঞানিক যাত্রা অব্যাহত রাখা উচিত।

 

সূত্র: Nature 655, 284 (2026) doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-02000-x

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 − 3 =