শিশু -কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা

শিশু -কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৭ জুলাই, ২০২৬

২০২২ সালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবহার কোভিড মহামারির আগের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই পরিবর্তনের কারণ খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেট কলেজ অব মেডিসিনের গবেষকেরা ১ কোটি ৩০ লক্ষেরও বেশি শিশু ও কিশোরের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হয় ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। মোট ৭২টি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমন্বয়ে গঠিত TriNetX U.S. Collaborative Network থেকে। গবেষণায় দেখা গেছে, মহামারির প্রথম দিকে নতুন মানসিক রোগ নির্ণয়, থেরাপি গ্রহণ এবং মানসিক রোগের ওষুধের নতুন প্রেসক্রিপশন-সবকিছুর হারই কমে যায়। কিন্তু ২০২১ সালের মার্চের পর থেকে এই প্রবণতা দ্রুত বদলে যায়। ২০২২ সালে নতুন মানসিক রোগ নির্ণয়ের সংখ্যা আগের তুলনায় ২৪ শতাংশ, থেরাপি নেওয়া ২৬ শতাংশ এবং প্রথমবারের মতো মানসিক রোগের ওষুধ নেওয়ার হার ৩৫ শতাংশ বেড়ে যায়। আসলে এটি কিন্তু সাময়িক বৃদ্ধি ছিল না। বরং ২০২২ সালের আগস্টে এই প্রবণতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন অধিকাংশ স্কুল ইতিমধ্যেই খুলে গেছে। প্রধান গবেষক রমন বাওয়েজা বলেন, শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি কোভিডের আগেই শুরু হয়েছিল। মহামারি সেই সমস্যাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। যারা আগে থেকেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছিল, তাদের চিকিৎসায় খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বেড়েছে মূলত নতুন রোগীদের কারণে। অর্থাৎ, আগে চিকিৎসার বাইরে থাকা অনেক শিশু ও কিশোর প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্যব্যবস্থার আওতায় এসেছে। তবে এই পরিবর্তন সব শিশুর ক্ষেত্রে সমান নয়। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে কিশোরীদের উপর। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে প্রথমবারের মতো অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ নেওয়ার হার বেড়েছে ১৩৭ শতাংশ। আর ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ছিল ৬৫ শতাংশ। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, মহামারির পর যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত প্রায় ৪০ হাজার কিশোরী প্রথমবারের মতো অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট চিকিৎসা শুরু করেছে। অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টের পাশাপাশি উদ্বেগ কমানোর ওষুধ হাইড্রোক্সিজিন-এর নতুন প্রেসক্রিপশনও ৬১ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে কাউন্সেলিং বা ‘টক থেরাপি’ বেড়েছে মাত্র ২৬ শতাংশ । এটিই উদ্বেগের বিষয়। কারণ শিশুদের উদ্বেগ ও বিষণ্নতার চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিশুই থেরাপির বদলে সরাসরি ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা শুরু করছে। সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন দেখা গেছে ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে। এই বয়সে এডিএইচডি (ADHD) চিকিৎসায় ব্যবহৃত উদ্দীপক ওষুধের নতুন প্রেসক্রিপশন বেড়েছে ১৪৭ শতাংশ। যদিও এই বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা সাধারণত প্রথমে অভিভাবকদের আচরণগত প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ দেন, কারণ এত অল্প বয়সে এসব ওষুধ ব্যবহারের পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও সীমিত। তবে গবেষণায় শুধুমাত্র স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের তথ্য রয়েছে। অনেক শিশু মানসিক সমস্যায় ভুগলেও কখনও চিকিৎসা নেয় না, ফলে তারা এই বিশ্লেষণের বাইরে থেকে গেছে। তাছাড়া শ্বেতাঙ্গ শিশুদের তুলনায় এশীয়, হিস্পানিক, নেটিভ হাওয়াইয়ান, প্যাসিফিক আইল্যান্ডার, আমেরিকান ইন্ডিয়ান ও আলাস্কা নেটিভ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার হার এখনও অনেক কম। মহামারির সময় টেলিহেলথ এই বৈষম্য কমাবে বলে আশা করা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। তাই ভবিষ্যতে আরও সহজলভ্য, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এবং সবার জন্য সমান মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

 

সূত্র: Post-Pandemic Trends in Pediatric Mental Health Treatment: A Nationwide Study; JAACAP OPEN ; Earth . com ; July ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 + sixteen =