গ্লিওব্লাস্টোমা চিকিৎসায় বি-সেলের ভূমিকা 

গ্লিওব্লাস্টোমা চিকিৎসায় বি-সেলের ভূমিকা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৮ জুলাই, ২০২৬

মস্তিষ্কের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ও প্রাণঘাতী ক্যানসারগুলোর মধ্যে গ্লিওব্লাস্টোমা (GBM) অন্যতম। অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির মতো প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও এই ক্যানসারের রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা এখনও বেশি নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যানসার চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপি নতুন আশার আলো দেখালেও, গ্লিওব্লাস্টোমার ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা অতটা আশানুরূপ নয়। সম্প্রতি সায়েন্স ইমিউনোলজিতে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণা এই ধারণায় পরিবর্তন এনেছে। গবেষণাটিতে দেখা গেছে, সফল ইমিউনোথেরাপির জন্য শুধু টি-সেল নয়, বি-সেল এবং তাদের তৈরি অ্যান্টিবডিও সমান অপরিহার্য।

এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের গ্লিওমা মডেলে CTLA-4 ইমিউন চেকপয়েন্ট ব্লকেড থেরাপির কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন। তাঁরা দেখেন, এই চিকিৎসা টিউমারের ভেতরে নয়, বরং টিউমারের সঙ্গে যুক্ত ডিপ সার্ভাইক্যাল লিম্ফ নোডে শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সেখানে টি ফলিকুলার হেল্পার (TFH) কোষ সক্রিয় হয়ে বি-সেলকে পরিপক্ব হতে সহায়তা করে। এর ফলে বি-সেল জার্মিনাল সেন্টারে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ইমিউনোগ্লোবুলিন-জি (IgG) শ্রেণির বিশেষ অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যা গ্লিওমা কোষকে নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারে।জার্মিনাল সেন্টার হলো লিম্ফ নোড, প্লীহা প্রভৃতি লিম্ফয়েড অঙ্গগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠা বিশেষ একটি স্থান।

এই অ্যান্টিবডিগুলো রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে টিউমারে পৌঁছে ক্যানসার কোষের গায়ে আচ্ছাদন তৈরি করে। এরপর টিউমারের ভেতরে থাকা ম্যাক্রোফেজ সহজেই ওই অ্যান্টিবডি-চিহ্নিত ক্যানসার কোষ শনাক্ত করে গ্রাস (ফ্যাগোসাইটোসিস) করে নেয় ও ধ্বংস করে। অর্থাৎ, ক্যানসার কোষকে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কাছে দৃশ্যমান করে তোলে অ্যান্টিবডি। ফলে শরীরের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও দক্ষভাবে টিউমার নির্মূল করতে পারে।

এই গবেষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কার হলো, যেসব ইঁদুরের শরীরে অ্যান্টিবডি উৎপাদনকারী কোষ অনুপস্থিত ছিল, তাদের ক্ষেত্রে CTLA-4 ব্লকেড থেরাপি কার্যকর হয়নি। অর্থাৎ, শুধু টি-সেল সক্রিয় থাকাই যথেষ্ট নয়; বি-সেলের মাধ্যমে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়াও চিকিৎসার সাফল্যের জন্য অপরিহার্য।

এতদিন ধারণা ছিল, ইমিউনোথেরাপির মূল শক্তি টি-সেল। কিন্তু এই গবেষণার হাত ধরে দেখা গেল, ক্যানসার প্রতিরোধে টিউমার-ড্রেনিং লিম্ফ নোডে গড়ে ওঠা বি-সেলের প্রতিক্রিয়া এবং সেখান থেকে উৎপন্ন অ্যান্টিবডি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে ভবিষ্যতে এমন নতুন চিকিৎসা কৌশল তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যেখানে টি-সেল ও বি-সেল—উভয়কেই একসঙ্গে সক্রিয় করে আরও কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্যানসার প্রতিরোধ গড়ে তোলা যাবে।

যদিও গবেষণাটি এখনো প্রাণী মডেলে সীমাবদ্ধ, তবুও এটি গ্লিওব্লাস্টোমাসহ কঠিন ধরনের মস্তিষ্কের ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশা, ভবিষ্যতে এই আবিষ্কারের ভিত্তিতে আরও উন্নত ইমিউনোথেরাপি, অ্যান্টিবডিভিত্তিক চিকিৎসা এবং ব্যক্তিনির্দিষ্ট ক্যানসার থেরাপি উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে।

 

সূত্র: DOI: 10.1126/sciimmunol.adz2494

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 2 =