ইঁদুর কেন বমি করতে পারে না? 

ইঁদুর কেন বমি করতে পারে না? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২০ জুলাই, ২০২৬

বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীই শরীরে বিষাক্ত বা ক্ষতিকর কিছু প্রবেশ করলে বমির মাধ্যমে তা বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ইঁদুর স্বাভাবিকভাবে বমি করতে পারে না। এর কারণ হল- ইঁদুরের দেহের বিশেষ গঠন এবং তার স্নায়ুতন্ত্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ইঁদুরের খাদ্যনালি (ইসোফেগাস) ও পাকস্থলীর সংযোগস্থলে একটি শক্তিশালী পেশিবহুল অংশ থাকে, যাকে লিমিটিং রিজ বলা হয়। এই অংশটি পাকস্থলীর ভেতরের খাবারকে উপরের দিকে উঠে আসতে বাধা দেয়। ফলে মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীর মতো জোর দিয়ে পাকস্থলীর খাবার বাইরে বের করে দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

এ ছাড়া, বমি করার জন্য মধ্যচ্ছদা বা ডায়াফ্রাম ও পেটের পেশির সমন্বিত সংকোচন দরকার হয়। কিন্তু ইঁদুরের ডায়াফ্রামে সেই ধরনের স্বাধীন পেশি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও নেই। একই সঙ্গে তাদের মস্তিষ্কের ব্রেইনস্টেমে এমন স্নায়বিক ব্যবস্থা নেই, যা বিষাক্ত পদার্থ শনাক্ত করে বমির প্রতিক্রিয়া শুরু করতে পারে। ফলে শরীরে বিষ ঢুকলেও তারা বমি করতে পারে না।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, ইঁদুরের এমনতর বৈশিষ্ট্যের কারণ বিবর্তন ছাড়া আর দ্বিতীয় কিছু হতেই পারে না। ইঁদুর সাধারণত নতুন খাবার একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে খায়। যদি কোনো খাবার খাওয়ার পর অসুস্থ/অস্বস্তি বোধ করে, তাহলে ভবিষ্যতে সেই খাবার এড়িয়ে চলে। যেহেতু তারা বমি করে বিষ বের করতে অপারগ, তাই সেক্ষেত্রে ক্ষতিকর খাবারের প্রতি অনীহা তৈরি করে একপ্রকার নিজেদের রক্ষা করার কৌশল গড়ে তুলেছে।

এই কারণেই ইঁদুর মারার বিষ বা রোডেন্টিসাইড এত কার্যকর। ইঁদুর যখন অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট বা স্নায়ুতন্ত্রে আঘাতকারী বিষ খায়, তখন তারা তা বমি করে বের করতে পারে না। বিষ শরীরের ভেতরে জমতে থাকে এবং ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, বিভিন্ন অঙ্গের বিকলতা বা স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি ঘটায়। কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে এসব বিষ প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইঁদুর নতুন খাবার সম্পর্কে শুরুতে কিছুটা সতর্ক বা ভীত থাকে, যাকে নিওফোবিয়া বলা হয়। কিন্তু একবার যদি তারা কোনো বিষমিশ্রিত খাবারকে নিরাপদ মনে করে খেতে শুরু করে, সেই বিষ শরীরে থেকেই যায়, যেহেতু তারা বমি করে বের করতে পারে না। এবার যত সময় এগোয় শরীরে বিষের পরিমাণ বাড়তে থাকে, এর মধ্যেই যদি অজান্তে তারা আরও বিষ খেয়ে ফেলে, তখন মৃত্যুর হার স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এ কারণে শহর ও কৃষিজমিতে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে এসব বিষ কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়।

ইঁদুরের এই অনন্য শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার অন্দরে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। যেহেতু তারা বমি করতে পারে না, তাই বমি-সংক্রান্ত ওষুধ বা রোগ নিয়ে গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীদের কুকুর, বিড়াল বা ফেরেটের মতো অন্য প্রাণীর মডেল ব্যবহার করতে হয়। ইঁদুরের এই ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য প্রাণীর বিবর্তন, শারীরবিদ্যা এবং বিষবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে।

 

সূত্র: Horn, C.C., et al. “Why Can’t Rodents Vomit? A Comparative Behavioral, Anatomical, and Physiological Study.” PLoS ONE.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 + eight =