জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু সুরক্ষা ও ‘নোঙর প্রজাতি ‘ পরিকল্পনা  

জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু সুরক্ষা ও ‘নোঙর প্রজাতি ‘ পরিকল্পনা  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২২ জুলাই, ২০২৬

ভারতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ক্ষেত্রে বড় সাফল্য আসতে পারে মাত্র ন-টি গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ করলেই। নতুন এক গবেষণায় এমনই দাবি করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, সীমিত অর্থ ও জমির মধ্যেও এই কৌশল ভারতের সংরক্ষণ নীতিকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। যে ন-টি প্রাণীকে ‘অ্যাঙ্কর স্পিসিজ’ বা নোঙর প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে – সম্বর হরিণ, চিতাবাঘ, ঢোল (বন্য কুকুর), রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কিং কোবরা, গৌর, ভারতীয় প্যাঙ্গোলিন, স্লথ বিয়ার এবং গ্রেট হর্নবিল। প্রাণীগুলির আবাসস্থল সুরক্ষিত করা গেলে প্রায় ১.১ গিগাটন কার্বন বনভূমিতে ধরে রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সংরক্ষিত হবে ৭০০-রও বেশি মেরুদণ্ডী প্রাণীর আবাসস্থল। সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে সম্বর হরিণ, চিতাবাঘ ও ঢোল। এই তিনটির যেকোনও একটি প্রাণীর আবাসস্থল কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করা গেলে ভারতের অর্ধেকেরও বেশি মেরুদণ্ডী প্রাণীর আবাসস্থল এবং বিপুল পরিমাণ বনভিত্তিক কার্বন ভান্ডার রক্ষা করা সম্ভব। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক আকাশ লাম্বা বলেন, ভারতের সংরক্ষণ নীতিতে এই প্রাণীগুলির অনেকগুলিই ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। ফলে নতুন এই পদ্ধতি বাস্তবে প্রয়োগ করা অপেক্ষাকৃত সহজ হতে পারে। ভারতের বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইনের আওতাভুক্ত ১৬০টি বিপন্ন প্রাণীর আবাসস্থল বিশ্লেষণ করে ২,১৮৭টি স্থলচর প্রাণীর ব্যাপ্তি এবং বনাঞ্চলে সঞ্চিত কার্বনের তথ্য মিলিয়ে মূল্যায়ন করা হয়। কোন প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ করলে সবচেয়ে বেশি জীববৈচিত্র্য ও কার্বন একসঙ্গে রক্ষা করা সম্ভব তাই বিচার করা হয়। এই গবেষণার গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ ২০২৬ সালে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলনের আগে বিভিন্ন দেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার যৌথ কৌশল খুঁজছে। কুনমিং-মন্ট্রিয়ল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্ক-এর আওতায় ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ৩০ শতাংশ ভূমি ও জলভাগ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি বন ও বৃক্ষ আচ্ছাদন বাড়িয়ে অতিরিক্ত কার্বন শোষণের লক্ষ্যও রয়েছে। বর্তমানে ভারতের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্যের আওতায় রয়েছে। ফলে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আরও বড় পরিসরে সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্কও করেছেন। ভারতের সাবেক ন্যাশনাল বায়োডাইভার্সিটি অথরিটির চেয়ারম্যান ভি. বি. মাথুর বলেন, প্রজেক্ট টাইগার-এর সাফল্য শুধু বাঘের জন্য নয়; এর পেছনে ছিল দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, আইনি সুরক্ষা এবং শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো। একই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নতুন পরিকল্পনা সফল হবে না। অন্যদিকে, সিএসআইআরের গবেষক শালিনী ধ্যানী মনে করেন, শুধু বেশি কার্বন ধারণে সক্ষম বনাঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিলে মরুভূমি, উচ্চভূমির তৃণভূমি বা বিশেষ কিছু বাস্তুতন্ত্র উপেক্ষিত হতে পারে। এসব অঞ্চলে কার্বনের পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে এগুলোর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। গবেষকেরাও এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছেন। তাঁদের মতে, ‘নোঙর প্রজাতি’ পদ্ধতিকে সংরক্ষণ পরিকল্পনার একটি প্রাথমিক নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত, একমাত্র সমাধান হিসেবে নয়। সুতরাং ভবিষ্যতে শুধু জাতীয় উদ্যান বা অভয়ারণ্য বাড়ালেই হবে না; ব্যক্তিগত জমিতে বনায়ন, কৃষিবনায়ন, সম্প্রদায়-পরিচালিত সংরক্ষণ এলাকা, শহুরে বন, কর্পোরেট সংরক্ষণ প্রকল্প এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সবুজ ক্যাম্পাস- সবকিছুকেই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের অংশ করে নিতে হবে। সবচেয়ে বড়ো কথা, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনও সংরক্ষণ প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। তাই বন্যপ্রাণী, জলবায়ু এবং মানুষের স্বার্থকে একসঙ্গে বিবেচনায় রেখেই ভবিষ্যতের সংরক্ষণ নীতি তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা।

 

সূত্র: Nature India ; July; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 4 =