ছেলে-ভোলানো মোবাইলের বিপত্তি 

ছেলে-ভোলানো মোবাইলের বিপত্তি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৩ জুলাই, ২০২৬

কোনো শিশু হঠাৎ কান্না শুরু করলে বা রাগারাগি করলে অনেক বাবা-মাই তাকে শান্ত করার জন্য মোবাইল ফোন, ট্যাব বা অন্য কোনো স্ক্রিনে ভিডিও বা কার্টুন চালিয়ে দেন। এটা বর্তমান ব্যস্ত জীবনের খুবই পরিচিত একটা দৃশ্য। এই অভ্যাসকে গবেষকেরা মিডিয়া ইমোশন রেগুলেশন বা আবেগ নিয়ন্ত্রণে স্ক্রিন ব্যবহারের কৌশল বলে থাকেন। কিন্তু এটি কি আদৌ একটা শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য ভালো? সেটা বিতর্কিত বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ওহায়ো স্টেট ইউনিভার্সিটির (ও এস ইউ) গবেষক জেন শক্রফটের নেতৃত্বে পরিচালিত এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। কারণ সব শিশুর ওপর স্ক্রিন ব্যবহারের সময় ও প্রভাব একই রকম হয় না। গবেষণাটি ব্রিংহাম ইয়ং ইউনিভার্সিটির (বি অয়াই ইউ) দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প M.E.D.I.A.-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে করা হয়েছে। এখানে আড়াই বছর থেকে সাড়ে সাত বছর বয়স পর্যন্ত একই শিশুদের ছয়টি ধাপে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

এই গবেষণায় বিশেষভাবে দু-ধরনের মানসিক দক্ষতার ওপর নজর দেওয়া হয়। প্রথমটি হলো কগনিটিভ ফ্লেক্সিবিলিটি, অর্থাৎ কোনো নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা। দ্বিতীয়টি হলো ইনহিবিটরি কন্ট্রোল, অর্থাৎ কোনো কাজ করার আগে নিজেকে বিরত রেখে চিন্তা করার ক্ষমতা। এই দুটি দক্ষতাই ভবিষ্যতে পড়াশোনা, সামাজিক সম্পর্ক এবং আচরণগত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অধিকাংশ শিশুর ক্ষেত্রে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক কাজ করে। যে শিশুকে শান্ত করা কঠিন, তার ক্ষেত্রে বাবা-মা বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করেন। আবার অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর আত্মনিয়ন্ত্রণের দক্ষতার বিকাশেও প্রভাব ফেলে। এরপর সেই দক্ষতার পরিবর্তন ভবিষ্যতে বাবা-মায়ের স্ক্রিন ব্যবহারের সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করে। অর্থাৎ শিশু ও অভিভাবক উভয়েই একে অপরের আচরণকে প্রভাবিত করে।

তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে এই ধারা একই নয়। প্রায় ৬ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে সম্পর্কটি আরও জটিল এবং গবেষকেরা সত্যিই এর কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। আবার প্রায় ৭ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্ক্রিন ব্যবহারের প্রভাব তাদের মানসিক দক্ষতার ওপর পড়লেও সেই দক্ষতা বাবা-মায়ের স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাসকে প্রভাবিত করেনি।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই দ্বিতীয় দলের বাবা-মায়েদের মধ্যে বিষণ্নতার হার তুলনামূলক বেশি। গবেষকদের মতে, যখন বাবা-মা মানসিক চাপ বা ক্লান্তিতে ভোগেন, তখন শিশুকে সাময়িকভাবে শান্ত রাখতে স্ক্রিন তাদের কাছে সহজ একটি উপায় হয়ে ওঠে। তাই শুধুমাত্র স্ক্রিন ব্যবহারের জন্য বাবা-মায়েদের দোষারোপ না করে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও গুরুত্ব দেওয়াটাও জরুরি।

গবেষকদের মতে, শিশুদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে শুধু পরিবারের নয়, পুরো সমাজের সহযোগিতা দরকার। নিরাপদ খেলার জায়গা, পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সহায়তা এবং বাবা-মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন—এসবই শিশুদের অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। অর্থাৎ শিশুকে শান্ত করতে মাঝে মাঝে স্ক্রিন ব্যবহার করা হলেও, সেটিকে একমাত্র সমাধান না বানিয়ে বিকল্প উপায় গড়ে তোলাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর।

 

সূত্র: https://doi.org/10.1093/joc/jqag009

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × 1 =