সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫৫ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত এক বৃহৎ গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো জাতীয় সমস্যা মোকাবিলায় মানুষকে পদক্ষেপ নিতে সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করে বিজ্ঞানীদের মতামত এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সমর্থন। সরকার বা বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান কোনো প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেও, যদি বিজ্ঞানী ও সাধারণ নাগরিকরা একই সমাধানের পক্ষে একমত হন, তবে মানুষ সেই সমাধানকে সমর্থন করতে বেশি আগ্রহী হয়। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS) পত্রিকায়।
গবেষণাটি পরিচালনা করেন বোস্টন কলেজ ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আনন্দিতা সাব্রেওয়াল এবং তাঁর সহকর্মীরা। চারটি পৃথক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের জানানো হয় যে একটা নির্দিষ্ট সমাধান বিজ্ঞানী, সাধারণ মানুষ, সরকারি সংস্থা অথবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমর্থন বা বিরোধিতা পাচ্ছে। এরপর অংশগ্রহণকারীদের জিজ্ঞাসা করা হয়, তারা ওই সমাধানকে সমর্থন করবেন কি না। সমর্থনের মধ্যে ছিল নীতির পক্ষে মত দেওয়া, অনুদান প্রদান, কোনো পণ্য বেছে নেওয়া কিংবা সামাজিক মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া প্রভৃতি বাস্তব পদক্ষেপ।
গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৮০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী সেই সমাধানকেই বেছে নিয়েছেন, যা বিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সমর্থন পেয়েছিল। এমনকি সরকার বা বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এর বিরোধিতা করলেও মানুষের সিদ্ধান্তে তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি। এই প্রবণতা জলবায়ু পরিবর্তন, টিকাদান এবং তথ্যের গোপনীয়তার মতো বিভিন্ন বিষয়েও একইভাবে দেখা গেছে।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই প্রভাব রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে কাজ করেছে। উদারপন্থী ও রক্ষণশীল—উভয় রাজনৈতিক মতের মানুষই বিজ্ঞানীদের মতামত এবং জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়েছেন। যদিও উদারপন্থীরা বিজ্ঞানীদের মতামতের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভর করেছেন, রক্ষণশীলরা বিজ্ঞান ও জনমত—উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়েছেন।
গবেষকেরা আরও জানান, মানুষ প্রায়ই সমাজে অন্যদের প্রকৃত মতামত সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করে, যাকে মনোবিজ্ঞানে ‘বহুত্ববাদী অজ্ঞতা’ (প্লুরালিস্টিক ইগনোরেন্স) বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অধিকাংশ মানুষ পদক্ষেপের পক্ষে থাকলেও অনেকেই মনে করেন তারা সংখ্যালঘু। এই ভুল ধারণা বশত অনেক মানুষ নিজের সমর্থন প্রকাশ করেন না। কিন্তু যখন স্পষ্টভাবে জানানো হয় যে বিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষ একই অবস্থানে রয়েছেন, তখন মানুষের মধ্যে অংশগ্রহণের আগ্রহ বেড়ে যায়।
গবেষকদের মতে, এই ফলাফল জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তিনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রচারাভিযানের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেবল সরকার বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে, যদি বিজ্ঞানীদের ঐকমত্য এবং সাধারণ মানুষের সমর্থনকে দৃশ্যমানভাবে তুলে ধরা যায়, তবে তা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন দেশে একই ধরনের গবেষণা চালিয়ে দেখা হবে, বিভিন্ন সমাজে বিজ্ঞান, সরকার ও জনগণের প্রতি আস্থার মাত্রা এই ফলাফলে কী ধরনের প্রভাব ফেলে।
সূত্র: Proceedings of the National Academy of Sciences.
