সমগ্র বিশ্বে উভচর প্রাণীদের ওপর নেমে আসা সবচেয়ে ভয়াবহ জীববৈজ্ঞানিক বিপর্যয়গুলোর একটি ঘটিয়েছে Batrachochytrium dendrobatidis (Bd) নামের একটি অণুবীক্ষণিক ছত্রাক। এই ছত্রাকের সংক্রমণে সৃষ্ট কাইট্রিডিওমাইকোসিস রোগ গত কয়েক দশকে শত শত ব্যাঙ, ভেক ও অন্যান্য উভচর প্রাণীর প্রজাতিকে বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে পরিচিত কোনো রোগজীবাণু এত ব্যাপক হারে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করেনি।
Bd মূলত উভচর প্রাণীর ত্বককে আক্রমণ করে। কিন্তু এই আক্রমণের প্রভাব কেবল ত্বকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। উভচরদের ত্বক জল ও খনিজ লবণের ভারসাম্য বজায় রাখা, এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো অত্যাবশ্যক শারীরবৃত্তীয় কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছত্রাকটি ত্বকের এই স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করলে শরীরে ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং শেষ পর্যন্ত হৃদ্যন্ত্র বিকল হয়ে প্রাণীর মৃত্যু ঘটতে পারে। আক্রান্ত প্রাণীদের মধ্যে সাধারণত অবসন্নতা, অস্বাভাবিক আচরণ এবং ত্বক খসে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়।
গবেষকদের ধারণা, বিশ্বব্যাপী উভচর প্রাণীর বাণিজ্যই এই ছত্রাকের দ্রুত বিস্তারের প্রধান কারণ। বিশেষ করে খাদ্য, গবেষণা ও পোষ্য প্রাণী হিসেবে ব্যবহৃত বুলফ্রগ বিভিন্ন দেশে ছত্রাকটি বহন করে নিয়ে যায়। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে Bd শীতল ও আর্দ্র পরিবেশে দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং বিশেষ করে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে উভচর প্রাণীর জনসংখ্যায় নজিরবিহীন ধস নামায়।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, Bd-এর প্রভাবে অন্তত ৫০১টি উভচর প্রজাতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০টি প্রজাতি সম্ভবত বন্য পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আরও ১২৪টি প্রজাতির সংখ্যা ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। ফলে শুধু অসংখ্য প্রাণী তো হারিয়ে গেছেই, উপরন্তু অনেক বাস্তুতন্ত্রের খাদ্যজাল ও পরিবেশগত ভারসাম্যও গভীরভাবে বদলে গেছে। কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে বহু প্রাণীর খাদ্যের উৎস হিসেবে উভচরদের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থাই এর অভিঘাত অনুভব করছে।
তবে এই অন্ধকার ছবির মধ্যেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা অঞ্চলের কিছু ইয়েলো-লেগড ফ্রগ প্রথম দফার ভয়াবহ সংক্রমণ থেকে টিকে যাওয়ার পর আবারও সংখ্যায় বাড়তে শুরু করেছে। জিন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এদের মধ্যে এমন কিছু উপকারী মিউটেশন তৈরি হয়েছে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে ত্বকের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হওয়া এবং ইন্টারফেরন উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে তারা Bd-এর বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে এই প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রাণীরাই বেশি টিকে রয়েছে। ফলে ছত্রাকটি এখনও পরিবেশে উপস্থিত থাকলেও কিছু উভচর জনসংখ্যা ধীরে ধীরে আবার বাড়ছে। অস্ট্রেলিয়া ও মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও একই ধরনের অভিযোজনের প্রমাণ মিলেছে। বিজ্ঞানীদের আশা, এসব প্রাকৃতিকভাবে প্রতিরোধী প্রাণীগোষ্ঠী ভবিষ্যতের সংরক্ষণমূলক প্রজনন কর্মসূচিতে এবং বিলুপ্তপ্রায় উভচর প্রাণীদের পুনঃপ্রবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
Bd-এর এই বৈশ্বিক মহামারি মানবসৃষ্ট বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অনিচ্ছাকৃত পরিবেশগত পরিণতির একটি কঠোর সতর্কবার্তা। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি যতই কঠিন সংকটের মুখোমুখি হোক না কেন, বিবর্তন ও অভিযোজনের শক্তি জীবনের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিতে পারে।
সূত্র: Scheele et al., “Amphibian fungal panzootic causes catastrophic and ongoing loss of biodiversity,” Science.
