সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা ও সুস্থ বার্ধক্য 

সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা ও সুস্থ বার্ধক্য 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩০ জুলাই, ২০২৬

বার্ধক্য জীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা। তবে প্রতিটি মানুষের শরীর একই গতিতে বার্ধক্যের দিকে এগোয় না। কারও শরীর প্রকৃত বয়সের তুলনায় বেশি সতেজ থাকে, আবার কারও ক্ষেত্রে বার্ধক্যের প্রভাব দ্রুত দেখা দেয়। সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, এই পার্থক্যের পেছনে খাদ্যাভ্যাস বা ব্যায়ামের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত অংশগ্রহণেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। আমরা সাধারণত অবসর বিনোদন বলতে বুঝি সংগ্রহশালা ঘুরে দেখা, সিনেমা দেখা, নাটক, কনসার্ট বা অপেরা উপভোগ করা। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণার দৌলতে আমরা দেখলাম, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত অংশগ্রহণ কেবল মানসিক প্রশান্তিই দেয় না, শরীরের জৈবিক বার্ধক্যের গতিও কমিয়ে দিতে পারে।

জাপানের ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স টোকিও-এর গবেষকদের পরিচালিত এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অফ এপিডেমিওলজি অ্যান্ড কমিউনিটি হেলথ-এ। এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সঙ্গে শারীরবৃত্তীয় বা জৈবিক বয়স -এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না তা নির্ণয় করা। বিজ্ঞানীরা এখানে কালানুক্রমিক বয়স এবং শারীরবৃত্তীয় বা জৈবিক বয়সের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেছেন। কালানুক্রমিক বয়স মানে একজন মানুষের জন্ম থেকে অতিক্রান্ত বছরের সংখ্যা, কিন্তু শারীরবৃত্তীয় বয়স বোঝায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও জৈবিক ব্যবস্থার কার্যক্ষমতা। একই বয়সের দুই ব্যক্তির শারীরবৃত্তীয় বয়স ভিন্ন হতেই পারে, কারণ জীবনযাপন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সামাজিক অভিজ্ঞতা শারীরিক বার্ধক্যের গতিকে প্রভাবিত করে।

গবেষণায় ইংল্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্যভিত্তিক ইংলিশ লঙ্গিটিউডিনাল স্টাডি অফ এজিং (ই এল এস এ)-এ অংশ নেওয়া ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১,৮৯৯ জন মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের নাড়ির চাপ, রক্তচাপ, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা, হিমোগ্লোবিন, ফাইব্রিনোজেন, গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (HbA1c), এলডিএল কোলেস্টেরল, দেহ ভর সূচক/BMI, হাতের মুঠোর শক্তি এবং হাঁটার গতি সহ মোট ১০টি শারীরিক সূচক মূল্যায়ন করে প্রত্যেকের শারীরবৃত্তীয় বয়স নির্ধারণ করেন।

এর পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীরা কত ঘন ঘন সিনেমা হলে যান, বা আর্ট গ্যালারি পরিদর্শন করেন এবং নাটক, কনসার্ট বা অপেরা উপভোগ করেন, সেটিও নথিভুক্ত করা হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে একটি সংস্কৃতি সম্পৃক্ততা স্কোর তৈরি করা হয়। প্রতিটি কার্যক্রমের জন্য ০ থেকে ৫ পর্যন্ত স্কোর দেওয়া হয় এবং সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ সংস্কৃতি সম্পৃক্ততা স্কোর ছিল ১৫।

দেখা গেল, যারা অন্তত কয়েক মাস পরপর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন, তাদের গড় শারীরবৃত্তীয় বয়স ছিল ৬৬.৯ বছর। অন্যদিকে, যারা খুব কম অংশ নিতেন, তাদের গড় শারীরবৃত্তীয় বয়স ছিল ৬৯.৯ বছর। অর্থাৎ একই ধরনের মানুষের মধ্যে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণকারীদের শরীর গড়ে প্রায় তিন বছর কম বয়সী হিসেবে কাজ করছিল।

গবেষকেরা আরও দেখেছেন, পারিবারিক আয়, চাকরি, দীর্ঘমেয়াদি রোগসহ অন্যান্য প্রভাবককে বিবেচনায় নেওয়ার পরও সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততার স্কোরে প্রতিটি এক পয়েন্ট বৃদ্ধি শারীরবৃত্তীয় বয়স গড়ে ০.০৮৫ বছর বা প্রায় ৩১ দিন কম হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।

তাহলে এই সম্পর্কের সম্ভাব্য কারণ কী? গবেষকদের মতে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের সামাজিক যোগাযোগ বাড়ায়, একাকিত্ব কমায়, মানসিক চাপ ও বিষণ্নতা হ্রাস করে এবং মানুষকে আরও সক্রিয় ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহিত করে। এই সবগুলো বিষয় একত্রে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।

তবে গবেষকেরা এটাও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এটি একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা, তাই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডই সরাসরি বার্ধক্য কমায়, এমন প্রখর দাবি এখনই করা যায় না। সুস্থ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই হয়তো বেশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন। তবুও গবেষণাটি এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যদি সমাজে সংগ্রহশালা, শিল্পকলা কেন্দ্র, সিনেমা হল ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আরও সহজলভ্য এবং সাশ্রয়ী করা যায়, তবে এগুলো সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করার জনস্বাস্থ্য কৌশলের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার মাধ্যমে যদি এই সম্পর্ক নিশ্চিত করা যায়, তাহলে চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের ধারণায় একটি নতুন মাত্রা যোগ হবে। হয়তো ভবিষ্যতে সুস্থ থাকার পরামর্শে ব্যায়াম ও সুষম খাদ্যের পাশাপাশি মাসে একদিন কিংবা নিয়মিত নাটক বা সিনেমা দেখার পরামর্শও যুক্ত হতে পারে। কারণ, সংস্কৃতির স্পর্শ শুধু মনকেই নয়, শরীরকেও দীর্ঘদিন তরুণ রাখতে সাহায্য করে।

 

সূত্র: BMJ Group. “Going to museums, movies, and theater may help your body stay younger.” ScienceDaily. ScienceDaily, 15 July 2026. DOI: 10.1136/jech-2025-225753<www.sciencedaily.com/releases/2026/07/260714225526.htm>.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × one =