ক্রায়ো-ইএম প্রযুক্তি

ক্রায়ো-ইএম প্রযুক্তি

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩০ জুলাই, ২০২৬

এক দশক আগে ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি (Cryo-EM) জীববিজ্ঞানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। অতিদ্রুত হিমায়িত জৈব অণুর ওপর ইলেকট্রন নিক্ষেপ করে বিজ্ঞানীরা সেই প্রথম ভাইরাস, রাইবোজোম, এনজাইম, অ্যান্টিবডি এবং অন্যান্য জটিল অণুর পরমাণু-স্তরের গঠন নির্ভুলভাবে দেখতে সক্ষম হন। এই ঘটনাটাই পরে ‘রেজোলিউশন রেভলিউশন’ নামে পরিচিতি পায়। এই প্রযুক্তিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালের তিনজন পথিকৃৎ নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

তবে বিজ্ঞানীদের মতে, ক্রায়ো-ইএমের প্রকৃত সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। নতুন লক্ষ্য আর কেবল অণুর একটি স্থির ছবি তৈরি নয়; এবার লক্ষ্য সময়ের সঙ্গে অণুর পরিবর্তনশীল রূপ, গতিশীলতা এবং জৈবিক আচরণ বোঝা।

বর্তমানে সিমন্স ফাউন্ডেশন এই প্রযুক্তিকে ঘষে মেজে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছে। ২০১৫ সালে নিউইয়র্ক স্ট্রাকচারাল বায়োলজি সেন্টারে প্রতিষ্ঠিত Simons Electron Microscopy Center (SEMC)-এর লক্ষ্য হলো আধুনিক ক্রায়ো-ইএম প্রযুক্তির বিকাশ, গবেষকদের প্রশিক্ষণ এবং জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল প্রশ্নের সমাধানে উন্নত মাইক্রোস্কোপি ব্যবহার করা। বর্তমানে কেন্দ্রটি ১৯টি উন্নত ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ পরিচালনা করছে। ২০২৫ সালেই প্রায় এক হাজার গবেষক এই সুবিধা ব্যবহার করেছেন এবং ৫০টিরও বেশি গবেষণাপত্রে কেন্দ্রটির অবদান স্বীকৃতি পেয়েছে।

ক্রায়ো-ইএমের শক্তি শুধু উন্নত যন্ত্রে সীমাবদ্ধ নয়; এর আসল সাফল্যের ভিত্তি হল জটিল গণিত ও কম্পিউটেশনাল অ্যালগরিদম। পরীক্ষায় এলোমেলোভাবে লক্ষ লক্ষ দ্বিমাত্রিক ছবি সংগ্রহ করা হয়। সেগুলোর কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান বা অভিমুখ নেই। উন্নত গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই বিচ্ছিন্ন ছবিগুলোকে একত্র করে একটি নির্ভুল ত্রিমাত্রিক কাঠামো তৈরি করা হয়। ফলে অণুর সূক্ষ্ম গঠন এমনভাবে দেখা সম্ভব হয়, যা আগে কল্পনাও করা যেত না।

প্রযুক্তির উন্নয়ন এখানেই থেমে নেই। নিউরন/ মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের দীর্ঘ শাখাগুলোকে পর্যবেক্ষণের সময় প্রচলিত বৃত্তাকার ইলেকট্রন বিমের কারণে অনেক তথ্য নষ্ট হয়ে যেত। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে SEMC-এর গবেষকেরা বিশ্বের প্রথম বর্গাকার ইলেকট্রন বিম তৈরি করেন। এর ফলে বৃহৎ স্নায়ুকোষের বিস্তৃত অংশ ক্ষতিগ্রস্ত না করেই উচ্চ রেজোলিউশনে চিত্র ধারণ সম্ভব হয়েছে। এতে মোটর প্রোটিন কীভাবে নিউরনের ভেতরে বিভিন্ন উপাদান পরিবহন করে, সে সম্পর্কেও নতুন তথ্য মিলছে।

অন্যদিকে, বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্লেষণের চ্যালেঞ্জও বেড়েছে। তাই এখন গবেষকেরা বায়েজিয়ান ইনফারেন্স, মেশিন লার্নিং এবং অন্যান্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। গবেষক দেবাঞ্জনা মাজি এই ধরনের অ্যালগরিদমের সাহায্যে আরএনএ অণুর পরিবর্তনশীল আকৃতি বিশ্লেষণ করছেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে যেখানে কেবল একটি গড় গঠন দেখা যায়, সেখানে নতুন বিশ্লেষণ কৌশল বিরল কিন্তু জৈবিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আকৃতিগুলোকেও শনাক্ত করতে সক্ষম।

এই নতুন বিশ্লেষণ পদ্ধতিগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করতে ২০২৩ সালে গবেষকেরা একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। একই ক্রায়ো-ইএম ডেটাসেট ব্যবহার করে বিভিন্ন গবেষক দলকে থাইরোগ্লোবিউলিন প্রোটিনের সব সম্ভাব্য আকৃতি শনাক্ত করতে বলা হয়। নয়টি গবেষণা দল মোট ৪১টি ভিন্ন বিশ্লেষণ পদ্ধতি উপস্থাপন করে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কোন পদ্ধতি সবচেয়ে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য ফল দেয়, তা তুলনা করার একটি নতুন মানদণ্ড গড়ে উঠছে।

গবেষকদের বিশ্বাস, ক্রায়ো-ইএমের ভবিষ্যৎ কেবল উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি তৈরিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উন্নত গণিত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয়ে এই প্রযুক্তি জীবন্ত অণুর গতিশীল আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে নতুন পথের হদিশ দিচ্ছে। এর মাধ্যমে রোগের আণবিক কারণ উদ্ঘাটন, নতুন ওষুধের উন্নয়ন এবং মৌলিক জীববিজ্ঞানের বহু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া আরও সহজ হবে।

সূত্র: Beyond the Cryo-EM Resolution Revolution

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen + two =