জৈবিক বার্ধক্য ও অল্প বয়সে ক্যানসার

জৈবিক বার্ধক্য ও অল্প বয়সে ক্যানসার

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩১ জুলাই, ২০২৬

আমাদের চিরাচরিত ধারণা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেহকে বিভিন্ন জটিল রোগ আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে, ফলত ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা সেই প্রচলিত ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্যালেন্ডার মেনে চলা বয়সের তুলনায় শরীরের জৈবিক বার্ধক্য যদি দ্রুত এগোয়,তবে অল্প বয়সেও ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

গবেষণায় ডিএনএর মিথাইলেশন-ভিত্তিক অত্যাধুনিক এপিজেনেটিক ক্লক ব্যবহার করে মানুষের জৈবিক বয়স নির্ণয় করা হয়েছে। এই প্রযুক্তি শরীরের কোষে জমে থাকা পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বোঝায়, একজন মানুষের দেহ তার প্রকৃত বয়স অপেক্ষা বাস্তবে কতটা বয়স্ক হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমান প্রজন্মের মানুষের শরীর আগের প্রজন্মের তুলনায় দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে। ফলে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও কোষকলা প্রত্যাশিত সময়ের আগেই ক্ষয়ে যাচ্ছে।

গবেষকদের মতে, আধুনিক জীবনযাত্রা এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাড়তি ব্যবহার, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, বায়ুদূষণ এবং বিভিন্ন পরিবেশগত রাসায়নিকের সংস্পর্শ শরীরের স্বাভাবিক বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। এর প্রভাব হিসেবে ৫৫ বছরের আগেই বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, যাদের জৈবিক বার্ধক্য বেশি, তাদের প্রারম্ভিক পর্যায়ের সলিড টিউমার/অস্বাভাবিক কোষের শক্ত পিণ্ড হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে ফুসফুস, পরিপাকতন্ত্র এবং জরায়ুর ক্যানসারের সঙ্গে এই সম্পর্ক সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ।

গবেষণাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে। শরীরের সব অঙ্গ সমান গতিতে বার্ধক্যের দিকে এগোয় না। উদাহরণস্বরূপ, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যদি দ্রুত বয়স্ক হয়ে পড়ে, তাহলে শরীর ক্যানসার কোষকে আগের মতো দক্ষতার সঙ্গে শনাক্ত ও ধ্বংস করতে পারে না। এর ফলে কম বয়সেই ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একইভাবে, চর্বিযুক্ত কোষকলার দ্রুত বার্ধক্য দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও বিপাকীয় ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে, যা কোলোরেক্টাল ক্যানসারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

গবেষকদের মতে, এই ফলাফল ভবিষ্যতের ক্যানসার প্রতিরোধ কৌশলে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। শুধুমাত্র জন্মসনদে লেখা বয়স নয়, শরীরের জৈবিক বয়স মূল্যায়ন করেও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং দূষণ থেকে নিজেকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখার মাধ্যমে জৈবিক বার্ধক্যের গতি কমিয়ে অল্প বয়সে ক্যানসারের ঝুঁকিও হ্রাস করা যেতে পারে। সুস্থভাবে দীর্ঘজীবী হতে হলে শুধু বছর গুনলেই হবে না, শরীরের প্রকৃত বয়সকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

সূত্র: Tian et al., presented at AACR Annual Meeting and covered in Nature Medicine-related reports on accelerated aging and early-onset cancers.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × 1 =