আদিবাসী খাদ্যজ্ঞান ও পুষ্টি কর্মসূচি

আদিবাসী খাদ্যজ্ঞান ও পুষ্টি কর্মসূচি

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১ আগষ্ট, ২০২৬

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংক্রান্ত বহু শতাব্দীপ্রাচীন জ্ঞান এখনও বিশ্বের বেশিরভাগ পুষ্টি কর্মসূচিতে গুরুত্ব পায় না। স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ক পরামর্শ এখনও উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষাতেই সীমাবদ্ধ। এমন তথ্য উঠে এসেছে ৩৯টি আন্তর্জাতিক গবেষণার পর্যালোচনায়। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার (ইউইএ) অধ্যাপক নিত্যা রাও ও তাঁর সহকর্মীরা এই পর্যালোচনা পরিচালনা করেছেন। গবেষণায় এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ওশেনিয়ার বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি জ্ঞান কীভাবে শেখানো, ভাগ করা বা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আন্তর্জাতিক নীতিমালায় আদিবাসী জ্ঞানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও স্বাস্থ্য ও পুষ্টি শিক্ষায় সেই দৃষ্টিভঙ্গি এখনো অনুপস্থিত। রাষ্ট্রের নীতিমালায় আদিবাসী খাদ্যজ্ঞান প্রায়ই উপেক্ষিত , এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এর মূল্যও অস্বীকৃত। গবেষণায় ‘ফুড সিস্টেমস লিটারেসি’ বা খাদ্যব্যবস্থা-সংক্রান্ত প্রাথমিক জ্ঞানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ শুধু কী খাবেন তা জানা নয়; বরং কোন মৌসুমে কোন বুনো খাদ্য পাওয়া যায়, কোথায় তা সংগ্রহ করতে হয়, কীভাবে রান্না করতে হয় এবং কারা তা খায়—এসব ব্যবহারিক জ্ঞানও এর অংশ। ভারতের পূর্বাঞ্চলের বনাঞ্চল নিয়ে এক গবেষণায় দেখা যায়, যেসব নারী বুনো শাকসবজি ও খাদ্য সংগ্রহ করতেন, তাঁদের খাদ্যতালিকা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। বিশেষ করে প্রধান ফসল ওঠার আগের সময়ে এই বুনো খাদ্যই পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে ওঠে। তবে এসব খাদ্য সংগ্রহের জন্য স্থানীয় পরিবেশ সম্পর্কে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা জ্ঞান অপরিহার্য। ভাষাও বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অনেক আদিবাসী ভাষায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষার সরাসরি অনুবাদ নেই। ফলে সরকারি খাদ্য নির্দেশিকা স্থানীয় মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। যেমন গুয়াতেমালার কিচে মায়া জনগোষ্ঠী খাদ্যকে ভাগ করে মৌসুম, উৎপত্তিস্থল ও ব্যবহার অনুযায়ী , অথচ সরকারি নির্দেশিকায় খাদ্যের শ্রেণিবিন্যাস সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই বাইরের ভাষায় দেওয়া পরামর্শ বাস্তবে কার্যকর হয় না। তবে কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক ফল দিয়েছে। গল্প বলা, রান্নার প্রদর্শনী, আলোচনা চক্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিল রেখে পুষ্টি শিক্ষা দিলে মানুষের অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। নিউজিল্যান্ডে মাওরি ও প্যাসিফিকা জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে তৈরি একটি স্বাস্থ্য অ্যাপ তার সফল উদাহরণ। ভারতের সাঁওতাল তরুণ-তরুণীদের নিয়ে পরিচালিত এক প্রকল্পে তারা প্রবীণদের কাছ থেকে ঐতিহ্যবাহী খাদ্যজ্ঞান সংগ্রহ করে প্রায় ৫০টি তথ্যচিত্র তৈরি করে নিজ নিজ গ্রামে প্রদর্শন করে। এতে হারিয়ে যেতে বসা খাদ্যজ্ঞান নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। অধ্যাপক নিত্যা রাওর মতে, শুধু তথ্য দিলেই হবে না; প্রবীণ, কৃষক, নারী, চিকিৎসক, নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের একসঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কারণ খাদ্যজ্ঞান কোনো পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ নয়, এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে রান্না, খাদ্য সংগ্রহ ও পারিবারিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় স্বাস্থ্যকর খাদ্যের পরামর্শ স্থানীয় মানুষের আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে থাকে বা সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয় না। ফলে বাস্তবতার কথা বিবেচনা না করলে পরামর্শ কার্যকর হয় না। গবেষকদের মতে, সফল পুষ্টি কর্মসূচির প্রথম ধাপ হওয়া উচিত স্থানীয় মানুষের জ্ঞানকে স্বীকৃতি দেওয়া। সেই ভিত্তির ওপর আধুনিক বিজ্ঞান যুক্ত করলে তবেই স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কর্মসূচি আরও কার্যকর ও টেকসই হতে পারে।

 

সূত্র: Earth . com ; July ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen − twelve =