সুস্থ মস্তিষ্ক, মানসিক স্থিতি ও নিরাপদ দৈনন্দিন জীবনের জন্য ঘুম একটি অপরিহার্য জৈবিক প্রয়োজনীয়তা। এক রাত যদি ঠিকমতো ঘুম না হয় স্বভাবতই পরদিন ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি বা মেজাজ খিটখিটে থাকে। কিন্তু এই ঘুমের সমস্যা যদি বরাবরের মতো চলতেই থাকে, তখন তার প্রভাব শুধুমাত্র দৈনন্দিন কর্মক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (এফ এই ইউ)-এর এক নতুন গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, ভিন্ন ধরনের ঘুম সংক্রান্ত সমস্যা মানুষের মস্তিষ্কের গঠনের স্থায়ী পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি ঘুমের ব্যাধি ও মস্তিষ্কের সম্পর্ক নিয়ে এ পর্যন্ত যত গবেষণা হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বিস্তৃত তুলনামূলক বিশ্লেষণগুলোর একটি। বিষয়টি সায়েন্টিফিক রিপোর্টস পত্রিকাতে বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে আরও দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং রোগভেদে ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসার উন্নয়নে সাহায্য করবে।
আজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ ঘুমকে কেন্দ্র করে নানা সমস্যায় ভুগছেন। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ৫ থেকে ৭ কোটি মানুষের কোনো না কোনো ধরনের ঘুমের ব্যাধি রয়েছে। এই বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে গবেষকরা ৫৭টি নিউরোইমেজিং গবেষণার তথ্য একত্র করে একটি বৃহৎ মেটা-অ্যানালিসিস পরিচালনা করেন। তাঁরা ঘুম সংক্রান্ত ব্যাধিকে দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করেন। এক, ডাইসমনিয়া, যেমন অনিদ্রা ও স্লিপ অ্যাপনিয়া, যেক্ষেত্রে ঘুমাতে বা ঘুম ধরে রাখতে সমস্যা হয়। দুই, প্যারাসমনিয়া, যেক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে হাঁটা, দুঃস্বপ্নজনিত ব্যাধি ও স্লিপ টেরর ইত্যাদি নিদ্রাকালীন অস্বাভাবিক আচরণ বা অভিজ্ঞতা দেখা যায়।
গবেষণায় দেখা গেল, উভয় ধরনের ঘুমের ব্যাধির ক্ষেত্রেই মস্তিষ্কের থ্যালামাস নামক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলটিতে কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রমাণ মিলেছে। বিশেষ করে ‘পালভিনার’ অংশে এই পরিবর্তন বেশি দেখা যায়। থ্যালামাস আমাদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করা তথ্যগুলিকে ছেঁকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নির্বাচন করে, মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং জটিল চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই অঞ্চলের পরিবর্তনের ফলে মনোযোগের ঘাটতি, ধীর প্রতিক্রিয়া, ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা এবং দৈনন্দিন কাজে বেশি ভুল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার পেছনে এটাই অন্যতম স্নায়ুবৈজ্ঞানিক কারণ হতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্যারাসমনিয়া-তে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের পোস্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স-এও লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটে। এই অঞ্চলটি প্রেরণা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, আত্মসচেতনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে এই ধরনের রোগীদের মধ্যে আচরণগত পরিবর্তন, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা এবং মানসিক অস্থিরতা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যেতে পারে। বিপরীতে, ডাইসমনিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে থ্যালামাস ছাড়া অন্য কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে ধারাবাহিক কাঠামোগত পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষকদের মতে, এটিই ইঙ্গিত করে যে ঘুমের সমস্যাগুলি মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে একভাবে নয়, ভিন্ন ভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ।
তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, মস্তিষ্কের এই পরিবর্তনগুলো কি ঘুমের ব্যাধির কারণ, নাকি এগুলো দীর্ঘদিনের ঘুমের সমস্যার ফল? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অবধি স্পষ্ট নয়। ভবিষ্যতে গবেষকরা ঘুমের মধ্যে হাঁটা, REM নিদ্রাচরণ সমস্যা বা Sleep Behavior Disorder-সহ বিভিন্ন ধরনের প্যারাসমনিয়ার ওপর আরও গভীর গবেষণা চালিয়ে কার্য-কারণ সম্পর্ক নির্ণয় করতে চান।
গবেষকদের বিশ্বাস, এই ফলাফল শুধু যে ঘুমের ব্যাধি সম্পর্কে আমাদের ধারণাকেই বদলে দেবে তা নয়, এমন চিকিৎসা ও প্রতিরোধ কৌশল তৈরিতেও সহায়তা করবে, যা একই সঙ্গে ঘুমের মান উন্নত করবে এবং মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোকে সুরক্ষিত রাখবে। ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়; সুস্থ মস্তিষ্ক ও সুস্থ জীবনের জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুমের কোনো বিকল্প নেই।
সূত্র: “Sleep disorders and structural alterations in brain regions linked with motivation: a neuroimaging meta-analysis” by Katharine E. Crooks, Chloe L. Hampson,et.al; 26th February 2026, published in ‘Scientific Reports’.
DOI: 10.1038/s41598-026-40818-7
