পোলট্রিতে মুরগির বিস্তার ছড়াচ্ছে ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার 

পোলট্রিতে মুরগির বিস্তার ছড়াচ্ছে ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ আগষ্ট, ২০২৬

বিশ্বজুড়ে শিল্পভিত্তিক মুরগি পালন বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পোলট্রি ফার্মিংয়ের দ্রুত সম্প্রসারণ খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি, একই সঙ্গে বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার -এর বিস্তার ও বিবর্তনকেও অভূতপূর্বভাবে ত্বরান্বিত করেছে। বর্তমানে এই ব্যাকটেরিয়াই বিশ্বে ডায়রিয়া ও খাদ্যবাহিত সংক্রমণের অন্যতম প্রধান কারণ। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত কয়েক দশকে মুরগির ঘনবসতিপূর্ণ খামারগুলো এই জীবাণুর জন্য এক আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে, সেই সঙ্গে এটি দ্রুত অভিযোজিত হয়ে আরও শক্তিশালী সংক্রামক হয়ে উঠছে।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশক থেকে বিশ্বে মুরগির সংখ্যা প্রায় সাত গুণ বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৩১ বিলিয়নে পৌঁছেছে। পৃথিবীর মোট পাখির জৈবভরের প্রায় ৭০ শতাংশই এখন পালিত মুরগি। এত বিশাল সংখ্যক মুরগিকে সীমিত জায়গায় একসঙ্গে পালন করার ফলে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা বিভিন্ন রোগজীবাণুর বিস্তার ও বিবর্তনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনিওস অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট-এর গবেষকরা ১৯৭৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৩০টি দেশের মুরগি ও বন্য পাখি থেকে সংগ্রহ করা প্রায় ২,৮০০টি ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার জিনোম বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের গবেষণার বিবরণ প্রোসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস (পি এন এ এস)-এ প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, ১৯০০ সালের পর থেকে মুরগি ও বন্য পাখির মধ্যে এই ব্যাকটেরিয়ার আদান-প্রদান বা হোস্ট ট্রানজিশন ১০০ গুণেরও বেশি বেড়েছে। বিশেষ করে ১৯৬০ সালের পর এই প্রবণতা অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে – যা শিল্পভিত্তিক পোলট্রি খামারের বিস্তারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

আরও দেখা গেছে, মুরগির দেহে অভিযোজিত ক্যাম্পাইলোব্যাক্টারের বিভিন্ন প্রকার দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এবং তাদের জিনগত বৈচিত্র্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই খামারে বিপুল সংখ্যক মুরগি থাকার কারণে একাধিক ধরনের ব্যাকটেরিয়া একই প্রাণীতে সংক্রমিত হতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতিই ব্যাকটেরিয়াগুলোর মধ্যে জিনগত বৈশিষ্ট্য বিনিময় এবং নতুন অভিযোজনের সুযোগ তৈরি করে।

ফলে ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার এমন সব বৈশিষ্ট্য অর্জন করছে, যা তাকে মুরগির অন্ত্রে আরও ভালোভাবে টিকে থাকতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এটি অক্সিডেটিভ স্ট্রেস/জারণ-জনিত চাপ সহ্য করার ক্ষমতা, চলাচলের দক্ষতা, ধাতব আয়নের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধক্ষমতা বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধও বাড়িয়ে তুলছে। এসব পরিবর্তনের ফলে আধুনিক পোলট্রি উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাকটেরিয়াটি আরও স্থায়ী হয়ে উঠছে এবং খাদ্যশৃঙ্খলে দূষণের ঝুঁকিও বাড়ছে।

বর্তমানে মানুষের মধ্যে ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার সংক্রমণের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশের উৎসই পোলট্রি। এই সংক্রমণে সাধারণত ডায়রিয়া, তীব্র পেটব্যথা, জ্বর ও বমিভাব দেখা দেয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি স্নায়ুতন্ত্রে গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, এমনকি পক্ষাঘাতের মতো বিরল কিন্তু মারাত্মক অবস্থাও তৈরি হতে পারে।

গবেষকদের মতে, শিল্পভিত্তিক মুরগি পালন বিশ্বজুড়ে সস্তায় প্রাণীজ প্রোটিন সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, এর ফলে রোগজীবাণুর পরিবেশগত গতিশীলতা আমূল বদলে গেছে। এর প্রভাব শুধু প্রাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যেও নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি এবং অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার বাড়িয়ে তুলছে।

তাই ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখতে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পোলট্রি খামারে জীবাণু নিয়ন্ত্রণ, উন্নত জৈবনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি। গবেষকদের মতে, মানবসভ্যতার অ্যানথ্রোপসিন যুগে খাদ্য উৎপাদন ও জনস্বাস্থ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে রোগজীবাণুর বিবর্তন ও বিস্তারের এই পরিবর্তনগুলোকে গভীরভাবে বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: Kyne, O., et al. “Accelerating Campylobacter zoonosis in the Anthropocene.” Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS), 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 1 =