সদর্থক চিন্তার মানসিক উপকারিতা 

সদর্থক চিন্তার মানসিক উপকারিতা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৭ আগষ্ট, ২০২৬

সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, সচেতনভাবে ইতিবাচক অভিজ্ঞতার দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং সেই অনুভূতিকে কিছুক্ষণ ধরে উপভোগ করার অভ্যাস আমাদের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতায় বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করে নিউরোপ্লাস্টিসিটি, অর্থাৎ নতুন অভিজ্ঞতা ও বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে মস্তিষ্কের নিজেকে নতুনভাবে সাজিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা।

মানুষের মস্তিষ্কে স্বাভাবিকভাবেই একটি নেতিবাচক-পক্ষপাত থাকে। বিবর্তনের ধারায় এটি গড়ে উঠেছে, কারণ অতীতে বিপদ দ্রুত শনাক্ত করতে পারাই ছিল বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত। তাই খারাপ ঘটনা, সমালোচনা বা দুঃখজনক অভিজ্ঞতা আমাদের মনে দীর্ঘদিন রয়ে যায়, অথচ ভালো মুহূর্তগুলো খুব সহজেই হারিয়ে যায়।

তবে গবেষণা বলছে, প্রতিদিন যদি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস করি, ভালো ঘটনার কথা লিখে রাখি বা আনন্দদায়ক কোনো অভিজ্ঞতাকে সচেতনভাবে কিছুক্ষণ ধরে অনুভব করি, তাহলে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের ইতিবাচক অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত অংশগুলো আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স নামক অঞ্চল গুলি। ওইগুলিই আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ইতিবাচক চিন্তার সঙ্গে যুক্ত। ইতিবাচক চিন্তা এসব অঞ্চলে স্নায়বিক সংযোগ আরও শক্তিশালী করে।

ধরুন, কেউ আপনার প্রতি আন্তরিকভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল, সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখলেন, অথবা নিজের কোনো ছোটখাটো সাফল্যে আনন্দ পেলেন। যদি সেই মুহূর্তটিকে অন্তত ১০ থেকে ৩০ সেকেন্ড ধরে মনোযোগ দিয়ে অনুভব করেন, তাহলে সেই অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুকোষগুলো বারবার সক্রিয় হবে। স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায়, যে নিউরনগুলো একসঙ্গে সক্রিয় হয়, তারা পরস্পরের সংযোগও আরও দৃঢ় করে। ফলে আশাবাদ, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত স্নায়ুপথগুলো ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

কয়েক সপ্তাহ ধরে এই অনুশীলন চালিয়ে গেলে শেখা, স্মৃতিশক্তি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের কিছু অংশে ঘিলু (গ্রে ম্যাটার) বৃদ্ধি পেতে পারে। সেই সঙ্গে অতিরিক্ত চাপ ও উদ্বেগ সংশ্লিষ্ট স্নায়বিক নেটওয়ার্কের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কমে আসে। এর ফলে উদ্বেগ হ্রাস পায়, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়ে এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও ইতিবাচক মানসিকতা বজায় রাখা সহজ হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘ সময়ের ধ্যান বা জটিল কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন মাত্র কয়েক মিনিট সময় নিয়ে জীবনের ছোট ছোট ভালো দিকগুলো খেয়াল করা, সেগুলোকে গভীরভাবে অনুভব করা এবং কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করাই যথেষ্ট। নিয়মিত এই অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে নিউরোপ্লাস্টিসিটির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে আরও শান্ত, সুখী, ইতিবাচক ও মানসিকভাবে দৃঢ় একটি মস্তিষ্ক গড়ে তোলা সম্ভব।

 

সূত্র:”The Neuroscience of Gratitude & Its Effects on the Brain,” PositivePsychology.com (summarizing peer-reviewed fMRI studies including Zahn et al).

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve − five =