শিক্ষা মানুষকে সচেতন করে। তাই সাধারণত মনে করা হয়, উচ্চশিক্ষিত মানুষ হয়তো পরিবেশ সম্পর্কে একটু বেশিই সচেতন হবেন। তাদের জীবনযাপন হয়তো তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব হওয়ার কথা। কিন্তু, সাম্প্রতিক এক বিশ্বজোড়া গবেষণা দেখিয়েছে, বাস্তব চিত্রটা মোটেই এরকম নয়। শিক্ষিত হলেই পরিবেশের কথা ভেবে সে জিভে লাগাম লাগাবে, এ একেবারে ভুল কথা। বিশ্বের ১৬৫টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত মানুষের খাদ্যাভ্যাস থেকেই গড়ে সর্বাধিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। অর্থাৎ, পরিবেশ সম্পর্কে অনেকের থেকে অনেক বেশি জ্ঞান থাকলেও খাদ্য নির্বাচনে সেই সচেতনতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হয় না।
গবেষণাটি বিস্তারিতভাবে নেচার ফুড পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এতে গবেষকেরা বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষার স্তর এবং শহর বা গ্রামে বসবাসের ভিত্তিতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করেন। ফলাফলে দেখা যায়, শহরে বসবাসকারী ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী উচ্চশিক্ষিত পুরুষদের খাদ্যতালিকার পরিবেশগত প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এর ফলে শহুরে জনগোষ্ঠীর খাদ্যব্যবস্থা গ্রামীণ এলাকার তুলনায় অনেক বেশি পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তাদের প্রতিদিনের খাবার উৎপাদনে গড়ে ৫.৭ কেজি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়, যা বিশ্বের মোট খাদ্যজনিত গড় নির্গমনের তুলনায় ৫৫ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে, কম শিক্ষিত ৩৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী গ্রামীণ নারীদের খাদ্য থেকে সবচেয়ে কম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হয়, প্রতিদিন মাত্র ২.৮৫ কেজি। এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বছরে কার্বন নিঃসরণের পার্থক্য এক টনেরও বেশি। দেখা যায়, উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী খাদ্যতালিকায় প্রাণীজ খাদ্যের অংশ তুলনামূলকভাবে বেশি, আর কম নিঃসরণকারী খাদ্যতালিকায় উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের অনুপাত বেশি। বিশ্বব্যাপী পুরুষদের খাদ্যাভ্যাস থেকেও নারীদের তুলনায় বেশি কার্বন নিঃসরণ হয়। পুরুষদের যা খাদ্যাভ্যাস তাতে নারীদের তুলনায় তাদের জন্যই বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হয়।
গবেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ শুধু শিক্ষা নয়, বরং শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত উচ্চ আয় ও মাত্রাতিরিক্ত ভোগবিলাসী মানসিকতা। সাধারণ ভাবে বেশি শিক্ষিত মানুষের আয়ও তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। ফলে তারা মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য এবং অন্যান্য উচ্চ-সম্পদনির্ভর খাবার বেশি কেনার সামর্থ্য রাখেন। তাছাড়া, এই তথাকথিত বিদ্যে বোঝাই বাবুমশাইদের আবার এসব খাবার ছাড়া মুখেও রোচে না, পাছে তাদের সামাজিক মান মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। অর্থাৎ, পুঁথিগত বিদ্যায় পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা থাকলেও বাস্তবে তাদের দাবি হল, পকেটে পয়সা থাকলে কেন জীবনকে উপভোগ করব না? আর, এসব খাদ্য উৎপাদনে প্রচুর জমি,জল ও শক্তির প্রয়োজন হয় এবং একই সঙ্গে বেশি কার্বনও নিঃসরণ ঘটে। ফলে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা থাকলেও বাস্তবে তাদের খাদ্যাভ্যাসের যেমন হাল চাল তাতে তারা পরিবেশের উপকার করতে গিয়ে ক্রমাগত ক্ষতিই করে যাচ্ছে।
তবে এই গবেষণার হাত ধরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যও সামনে এসেছে। সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণকারী খাদ্যাভ্যাসও সব সময় সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর নাও হতে পারে। কম শিক্ষিত ও দরিদ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য থেকে কম নির্গমন হলেও তাদের খাদ্যমানও তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বিপরীতে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার সঙ্গে সাধারণভাবে কম কার্বন নিঃসরণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা যায়, খাদ্যের স্বাস্থ্যমানের সূচক প্রতি ৫ শতাংশ বাড়লে গড়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমে ৭.৭ শতাংশ, জলের ব্যবহার কমে ৪.৪ শতাংশ এবং জমির ব্যবহার কমে ৭.২ শতাংশ। এছাড়াও, খাদ্যের স্বাস্থ্যমান উন্নত হলে শুধু গ্রিনহাউস গ্যাসই নয়, জলের ব্যবহার এবং কৃষিজমির ওপর চাপও কমে।
তবে, সব দেশের জন্য একই ধরনের খাদ্যনীতি কার্যকর হবে না। বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও কৃষ্টিগত বাস্তবতা ভিন্ন হওয়ায় টেকসই খাদ্যব্যবস্থার কৌশলও আলাদা হওয়াটাই উচিত। তাই শুধু খাদ্যের ওপর কর বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিবর্তে, উচ্চ-প্রভাবসম্পন্ন ভোক্তাদের উদ্দেশে সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং নীতিগত সহায়তা আরও কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে, এসব নীতি বাস্তবায়নের সময় নিম্ন আয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকরা।
তাঁদের সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব খাদ্যে উৎসাহদান এবং উপযুক্ত নীতিগত সহায়তা দিলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব।
সূত্র: Higher education linked to higher food-related emissions – Earth.com
