অনুন্নত বিশ্বে বাড়ছে কলেরার প্রকোপ

অনুন্নত বিশ্বে বাড়ছে কলেরার প্রকোপ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ আগষ্ট, ২০২৬

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে কলেরা এখন প্রায় অতীত। সেখানে বছরে ২০টিরও কম কলেরা সংক্রমণ ধরা পড়ে। তার বেশিরভাগই বাইরে থেকে আক্রান্ত হয়ে ফেরা মানুষ। কিন্তু বিশ্বের দরিদ্র ও সংঘাত কবলিত দেশগুলিতে এই জলবাহিত রোগ এখনও বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিশ্বজুড়ে কলেরার সংক্রমণ প্রায় ১৭৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২১ সালে বিশ্বে ২ লাখ ২৩ হাজারের বেশি সংক্রমণ নথিভুক্ত হলেও, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৬ লাখ ১৪ হাজার ৮০০-রও বেশি হয়েছে। একই বছরে ৩৩টি দেশে প্রায় ৭,৬০০ জনের কলেরায় মৃত্যু হয়েছে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে হু-র মতে, প্রকৃত সংক্রমণের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। প্রতি বছর বিশ্বে ১৩ লাখ থেকে ৪০ লাখ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হন এবং ২১ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৪৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। ২০২৫ সালে কলেরায় আক্রান্তদের মৃত্যুহার ছিল ১.২ শতাংশ। WHO-র মতে, উন্নত চিকিৎসা থাকলে এই হার ১ শতাংশের নীচে রাখা সম্ভব। কিন্তু শুধু আফ্রিকাতেই ওই বছরের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটেছে। ইদানীং সুদানে নতুন করে কলেরার প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করেছে। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও নিরাপদ পানীয় জলের অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। মার্চ ২০২৬-এ আগের প্রাদুর্ভাব শেষ হওয়ার ঘোষণা হলেও, মাত্র দু’মাস পরে ফের সংক্রমণ শুরু হয়। ১০ জুলাই পর্যন্ত সেখানে ১,৩৩০টির বেশি সংক্রমণ এবং ১১৪ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। হু জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে মৃত্যুহার ছিল ১৩.৭ শতাংশ, যা স্বাস্থ্য পরিষেবার সংকটকেই তুলে ধরে। কলেরা ভিব্রিও কলেরি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হয়। তীব্র ডায়রিয়ার কারণে শরীর দ্রুত জলশূন্য হয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা না পেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু হতে পারে। অথচ এটি সবচেয়ে সহজে নিরাময়যোগ্য সংক্রামক রোগগুলিরও একটি। অধিকাংশ রোগী বিশুদ্ধ জল, চিনি ও লবণের মিশ্রণে তৈরি ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস) খেলেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। কেবলমাত্র গুরুতর ক্ষেত্রে স্যালাইন ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয়। তবে সমস্যার মূলে একেবারে রয়েছে বিশুদ্ধ জলের অভাব। এখনও বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ নিরাপদ পানীয় জল পায় না। দ্রুত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন, বন্যা-খরা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি কলেরা ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। কলেরা প্রতিরোধে কার্যকর মুখে খাওয়ার টিকা থাকলেও, বিশ্বজুড়ে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। তাই অনেক দেশে একজনকে একটি ডোজ দিয়েই বেশি মানুষকে সুরক্ষার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কলেরা কোনও অনিবার্য রোগ নয়। বিশুদ্ধ জল, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন, দ্রুত চিকিৎসা, ওআরএস এবং টিকাকরণ নিশ্চিত করা গেলে অধিকাংশ মৃত্যুই রোধ করা সম্ভব। হু-র লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে কলেরাজনিত মৃত্যু ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনা। সেই লক্ষ্য পূরণে এখন সবচেয়ে জরুরি নিরাপদ জল ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আরও বেশি বিনিয়োগ।

 

সূত্র: The Conversation ; Aug ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve − 8 =