দীর্ঘস্থায়ী টিনিটাসে মস্তিষ্কের পরিবর্তন 

দীর্ঘস্থায়ী টিনিটাসে মস্তিষ্কের পরিবর্তন 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ আগষ্ট, ২০২৬

অনেকসময়ই এরকম হয়েছে কোনো বাহ্যিক শব্দ না থাকলেও কানে অনেক ক্ষণ ধরে শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ বা ঘণ্টাধ্বনির মতো তীক্ষ্ণ শব্দ শোনা যাচ্ছে বলে আমাদের মনে হয়। একে বলে টিনিটাস। অনেকের ক্ষেত্রে এটি সাময়িক হলেও কারও কারও জন্য এটাই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়। গবেষণা বলছে, এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু কানের ক্ষতি নয়, বরং মস্তিষ্কের গভীরে ঘটে যাওয়া এক জটিল স্নায়বিক পুনর্গঠন কাজ করে। অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ধরে অস্তিত্বহীন একটি শব্দের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে মস্তিষ্ক নিজেই তার স্নায়বিক সংযোগকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলে।

টিনিটাসের সূচনা সাধারণত শ্রবণশক্তি হ্রাস, অতিরিক্ত শব্দদূষণের সংস্পর্শ বা কানের ভেতরের সূক্ষ্ম ক্ষতির কারণে হয়। সেক্ষেত্রে কানের স্বাভাবিক শ্রবণসংকেত কমে গেলে মস্তিষ্ক সেই ঘাটতি পূরণ করতে নিজের কার্যকলাপ বাড়িয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, শ্রবণপথের গুরুত্বপূর্ণ অংশের স্নায়ুকোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। যেমন ডরসাল কক্লিয়ার নিউক্লিয়াস, ইনফেরিয়র কোলিকুলাস এবং অডিটরি কর্টেক্সের স্নায়ু কোষ। তারা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে এবং একসঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে কাজ করতে শুরু করে। এই বাড়তি কার্যকলাপই বাস্তবে কোনো শব্দ না থাকলেও মস্তিষ্কে শব্দের অনুভূতি সৃষ্টি করে।

সময়ের সঙ্গে এই অস্বাভাবিক কার্যকলাপ মস্তিষ্কের টোনোটপিক ম্যাপ বা শব্দের কম্পাঙ্কভিত্তিক স্নায়বিক মানচিত্রকেও বদলে দেয়। টিনিটাসের সঙ্গে সম্পর্কিত নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের জন্য বরাদ্দ স্নায়বিক অঞ্চল ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে এবং আশপাশের অংশও দখল করে নেয়। ফলে কল্পিত শব্দটি আরও স্থায়ী, স্পষ্ট এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

কিন্তু টিনিটাসের প্রভাব শুধু শ্রবণব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘস্থায়ী অবস্থায় এটি আবেগ, স্মৃতি এবং মনোযোগ নিয়ন্ত্রণকারী মস্তিষ্কের অংশগুলোকেও প্রভাবিত করে। অ্যামিগডালা ও হিপোক্যাম্পাসের মতো লিম্বিক কাঠামোর সঙ্গে শ্রবণব্যবস্থার সংযোগ আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। এর ফলে কানের শব্দটি ধীরে ধীরে উদ্বেগ, মানসিক চাপ, বিরক্তি এবং নেতিবাচক স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ও ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্কের কার্যকলাপেও পরিবর্তন ঘটে। যা মানুষকে শব্দটির প্রতি অতিমাত্রায় সচেতন করে তোলে। এর পরিণতিতে উদ্বেগ বাড়ে, মনোযোগ ব্যাহত হয়, ঘুমের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

গবেষকেরা মনে করেন, এই অবস্থার মূল কারণগুলোর একটি হলো স্নায়ুকোষের উত্তেজক ও নিস্তেজক সংকেতের সূক্ষ্ম ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়া। ফলে মস্তিষ্কে এমন এক স্বয়ংক্রিয় স্নায়বিক চক্র গড়ে ওঠে, যা টিনিটাসের অনুভূতিকে নিজেই টিকিয়ে রাখে। পাশাপাশি মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার/ঘিলু ও হোয়াইট ম্যাটারের গঠন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের পারস্পরিক যোগাযোগেও পরিবর্তন দেখা যায়, যা দীর্ঘমেয়াদি নিউরোপ্লাস্টিক পরিবর্তনের প্রামাণ্য ইঙ্গিত।

টিনিটাস কেবল দীর্ঘস্থায়ী কানের সমস্যা নয়, এটি মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগের এক জটিল অভিযোজন। তাই আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখন সাউন্ড থেরাপি, নিউরো-মডুলেশন এবং নিউরো-প্লাস্টিসিটিকে লক্ষ্য করে নতুন চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের আশা, এসব পদ্ধতির মাধ্যমে মস্তিষ্কের এই অস্বাভাবিক পুনর্গঠন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে এনে দীর্ঘস্থায়ী টিনিটাসের কষ্ট কমানো সম্ভব হবে।

সূত্র: Møller, A.R. Neural plasticity in tinnitus. Progress in Brain Research, 157, 365-372.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + 4 =