বক্তার চোখ ও শিশুর ভাষাশিক্ষা 

বক্তার চোখ ও শিশুর ভাষাশিক্ষা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৮ আগষ্ট, ২০২৬

আমরা দেখেছি , কেউ কথা বললেই শিশুরা তার মুখ ও চোখের দিকে খুব সজাগ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কারণ একটি শিশু যখন কারও কথা শোনে, তখন তার মস্তিষ্ক শুধু শব্দ গ্রহণ করে না। নতুন এক গবেষণা বলছে, বক্তার চোখের দিকে তাকানো মানে হল শিশুর মস্তিষ্ক তখন ভাষা শেখার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। অর্থাৎ, শিশুর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলা নিছক সামাজিক যোগাযোগ নয়; ভাষা শেখার প্রক্রিয়াতেও এর সরাসরি ভূমিকা থাকতে পারে।

কেমব্রিজ ও সিঙ্গাপুরে পরিচালিত এই বিশেষ গবেষণায় অংশ নেয় ৪৭ জন শিশু, যাদের গড় বয়স ৯.৪ মাস। গবেষকেরা শিশুদের এমন একটি ভিডিও দেখান, যেখানে এক নারী বক্তা একটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম ভাষায় তৈরি শব্দ বারবার উচ্চারণ করছিলেন। পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল— বক্তার চোখ দেখতে পাওয়াটা শিশুর ভাষা শেখার ক্ষমতাকে কতটা প্রভাবিত করে তাই বোঝা।

এ জন্য একই ভিডিওতে বিভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। কখনও বক্তার চোখ পরিষ্কার দেখা গেছে, কখনও চোখ অন্ধকার করে দেওয়া হয়েছে, আবার কখনও চোখ পুরোপুরি আড়াল করা হয়েছে। অন্য সবকিছু, যেমন বক্তার মুখের অভিব্যক্তি, মাথার অবস্থান এবং কথা বলার ধরন, সব একই রাখা হয়েছিল।

দেখা গেছে, চোখ স্পষ্ট দেখা গেলে শিশুরা কৃত্রিম ভাষার শব্দের গঠন বা পুনরাবৃত্ত বিন্যাস সবচেয়ে ভালোভাবে ধরতে পেরেছে। পরে পরিচিত ও অপরিচিত শব্দ শোনানোর সময় তাদের দৃষ্টির আচরণেও সেই শেখার প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু চোখ অন্ধকার বা আড়াল করা হলে এই পার্থক্য দ্রুত কমে যায়।

শুধু আচরণগত পরিবর্তন নয়, শিশুর মস্তিষ্কেও এর ছাপ দেখা যায়। গবেষকেরা শিশু এবং বক্তার মস্তিষ্কের কার্যকলাপ একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেন। দেখা যায়, বক্তার মস্তিষ্কের কার্যকলাপের সঙ্গে শিশুর মস্তিষ্কের তরঙ্গ বেশি সমন্বিত হয়েছিল। সেকারণেই সে কৃত্রিম ভাষাটিও তুলনামূলকভাবে ভালো শিখেছিল। এই মস্তিষ্ক-সমন্বয় শিশুদের ভাষা শেখার পার্থক্যের প্রায় ২৪.৬ শতাংশ ব্যাখ্যা করতে পেরেছে। চোখ স্পষ্ট দেখা গেলে শিশুর মস্তিষ্ক বক্তার কথার ছন্দের সঙ্গেও বেশি তাল মিলিয়েছিল। গবেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু মনোযোগের নয়। শিশুর মস্তিষ্ক সম্ভবত চোখের যোগাযোগকে একটি সামাজিক সংকেত হিসেবে ব্যবহার করে বুঝতে পারে যে বক্তার কথাগুলো তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ভাষার শব্দ ও ছন্দ ধরার ক্ষেত্রে তাদের মস্তিষ্ক আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। তবে গবেষকেরা বলেছেন স্ক্রিনে ভিডিও দেখানোটা মুখোমুখি যোগাযোগের বিকল্প নয়। বাস্তব কথোপকথনে চোখের যোগাযোগের পাশাপাশি স্পর্শ, মুখভঙ্গি, অঙ্গভঙ্গি এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংকেতও থাকে।

এই গবেষণাটি একেবারেই ক্ষুদ্র পরিসরে এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হয়েছে। বাস্তব জীবনের ব্যস্ত, শব্দপূর্ণ পরিবেশে একই প্রভাব কতটা বজায় থাকে, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবুও এই গবেষণা শিশুর ভাষা বিকাশ সম্পর্কে একটি মোটের ওপর ধারণা দিয়েছে। মনে রাখতে হবে,কথা বলার সময় শিশুর চোখের দিকে তাকাচ্ছে মানেই সে শুধু ভালোবাসার উষ্ণতা নিচ্ছে তা নয়, সেই মুহূর্তে তার মস্তিষ্ক বাচনভঙ্গি থেকে কিছু শেখার জন্য সক্রিয় হয়েছে ।

সূত্র: Babies learn language better with eye contact – Earth.com, The full study was published in the journal Nature Communications.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × two =