ভাষার বিলুপ্তি 

ভাষার বিলুপ্তি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৯ আগষ্ট, ২০২৬

আজ পৃথিবীতে প্রায় ৭,৫০০টি ভাষা প্রচলিত। কিন্তু, মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন একটি সময় ছিল যখন ভাষার বৈচিত্র্য আজকের তুলনায় বহু গুণ বেশি ছিল। গবেষকদের মডেল অনুযায়ী, প্রায় ১,০০০ থেকে ৩,০০০ বছর আগে পৃথিবীতে দশ হাজার ভাষা প্রচলিত ছিল। এরপর ভাষার সংখ্যা দ্রুত কমতে শুরু করে। এই পতন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক যুগ শুরুর বহু আগেই শুরু হয়েছিল।

স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির গবেষকদের এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে সায়েন্স পত্রিকায়। লিখিত ইতিহাসের পূর্বে ঠিক কতগুলো ভাষা ছিল, তার সরাসরি প্রমাণ প্রায় নেই। তাই গবেষকেরা শিকারি-সংগ্রাহক ও মৎস্যজীবী ১৭১টি সমাজের তথ্য, প্রাগৈতিহাসিক জনসংখ্যার হিসাব এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক কম্পিউটার মডেল একত্র করেছেন।

তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১২,০০০ বছর আগে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৪৪ লাখ থেকে ৭০ লাখ। তখন আনুমানিক ৪,৫০০ থেকে ৬,২০০টি ভাষা প্রচলিত ছিল। কৃষির বিস্তার ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভাষার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। খাদ্য উৎপাদন সহজ হওয়ায় মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে এবং নতুন নতুন জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। এর ফলে বহু নতুন ভাষার জন্ম ও বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়। গবেষকদের হাজার হাজার সম্ভাব্য মডেলেও একই প্রবণতা দেখা গেছে, হলোসিন যুগের বেশিরভাগ সময়ে ভাষার সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, ভাষার বৈচিত্র্যের সর্বোচ্চ পর্যায় সম্ভবত খুব বেশি প্রাচীন নয়। প্রায় ১,০০০ থেকে ৩,০০০ বছর আগে পৃথিবীতে ভাষার সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল বলে মডেলগুলো ইঙ্গিত করছে। তখন হয়তো কয়েক অযুত ভাষা ছিল। গবেষকেরা এই সময়কে মানব ভাষার এক ধরনের স্বর্ণযুগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এরপর শুরু হয় বিপরীত প্রবণতা। বড় বড় রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী একে অপরের সংস্পর্শে আসে। রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ভাষাগুলো প্রশাসন, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছোট জনগোষ্ঠীর ভাষা ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। যুদ্ধ, রোগ, স্থানচ্যুতি ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও এতে ভূমিকা ছিল।

ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ গত প্রায় ৫০০ বছরে এই ভাষাহ্রাসকে তীব্রতর করেছে। তবে গবেষণাটি দেখাচ্ছে, ভাষা হারানোর প্রক্রিয়া তারও বহু আগে শুরু হয়েছিল।

গবেষকদের মতে, আজকের ভাষাগুলো আসলে অতীতের বিশাল ভাষাবৈচিত্র্যের একপ্রকার টিকে থাকা অংশ। যেসব জনগোষ্ঠী বিস্তৃত ও শক্তিশালী হতে পেরেছে, তাদের ভাষাই টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি ছিল। ফলে বর্তমানে কোনো ভাষার নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বেশি দেখা যায় বলেই যে তা মানুষের জন্য স্বাভাবিকভাবে বেশি কার্যকর, এমন সিদ্ধান্তও সবসময় সঠিক নয়।

ভাষার সঙ্গে ধর্ম, সামাজিক রীতি, আত্মীয়তার ধারণা ও সাংস্কৃতিক জ্ঞানও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। তাই ভাষার বিলুপ্তির সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে এমন বহু কৃষ্টিও, যার কোনো লিখিত ইতিহাস আজ আর নেই।

 

সূত্র: “The rise and fall of language diversity through the Holocene” by D. E. Blasi, M. J. Hamilton, R. D. Gray and C. L. Bowern, 23 July 2026, Science. DOI: 10.1126/science.adx4343

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 3 =