সামুদ্রিক শর্করা মিশছে সুমেরুর আকাশে 

সামুদ্রিক শর্করা মিশছে সুমেরুর আকাশে 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৬ আগষ্ট, ২০২৬

সুমেরু অঞ্চলের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে মেঘের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সূর্যের শক্তি পৃথিবীতে কতটা পৌঁছাবে এবং পৃথিবী থেকে কতটা তাপ মহাকাশে বেরিয়ে যাবে, এসবই মেঘ দ্বারা প্রভাবিত হয়। আবার, তুষারপাতের ক্ষেত্রেও মেঘের ভূমিকা রয়েছে। সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সমুদ্রের ঢেউ ও সামুদ্রিক জীব থেকে আসা লবণ ও জৈব পদার্থ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঠে সুমেরু অঞ্চলের মেঘ তৈরির উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পারে—বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট। এমনকি এগুলোর কিছু অংশ পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছের বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে ফ্রি ট্রপোস্ফিয়ার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

সমুদ্রের ঢেউ ভাঙা ও বুদ্‌বুদ ফেটে যাওয়ার সময় তৈরি হয় সি-স্প্রে বা সামুদ্রিক ক্ষুদ্র জলকণা। এসব কণার সঙ্গে সমুদ্রের লবণ এবং জৈব পদার্থও বাতাসে উঠে যায়। সামুদ্রিক শৈবাল ও ব্যাকটেরিয়া উৎপাদিত বিভিন্ন কার্বোহাইড্রেটের মধ্যে রয়েছে পলিস্যাকারাইড, অর্থাৎ ছোট ছোট গ্লুকোজ অণুর দীর্ঘ শৃঙ্খল। বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকা এই ক্ষুদ্র কণাগুলোই অনেক সময় মেঘের জলকণা ও বরফকণা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। ফলে এগুলোর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য মেঘের আচরণ, তুষারপাত এবং সুমেরুর শক্তির ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে।

জার্মানির Leibniz Institute for Tropospheric Research (TROPOS)-এর নেতৃত্বে গবেষকরা স্ভালবার্ডের Ny-Ålesund অঞ্চলে ২০২১ সালের শরৎ এবং ২০২২ সালের বসন্তে গবেষণা চালান। একটি বাঁধা হিলিয়াম বেলুনের সাহায্যে তাঁরা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩২১ থেকে ১,১১২ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত ১৪টি বায়ুর নমুনা সংগ্রহ করেন। একই সঙ্গে ভূমি থেকে বায়ুর নমুনা, Kongsfjorden-এর জল এবং সদ্য তৈরি সমুদ্র-স্প্রের নমুনাও সংগ্রহ করা হয়।

নমুনাগুলোতে সোডিয়াম ও বিভিন্ন কার্বোহাইড্রেট শনাক্ত করা হয়। সোডিয়ামকে একটি নির্ভরযোগ্য চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গবেষকরা দেখতে পান, প্রায় সব উচ্চতাতেই লবণ ও শর্করা -জাতীয় পদার্থ উপস্থিত ছিল। কিছু ক্ষেত্রে ওপরের বায়ুতে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি বায়ুর তুলনায় বেশি ছিল। এতে ধারণা করা হয়, শুধু সমুদ্র থেকে সরাসরি উঠে আসাই নয়, বায়ুমণ্ডলের ভেতরেও এসব জৈব পদার্থের পরিবর্তন বা নতুন করে সৃষ্টি হতে পারে।

আবহাওয়াও কণাগুলোর উচ্চতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোথাও বায়ু কয়েকশো মিটার পর্যন্ত ভালোভাবে মিশে যাওয়ায় ভূমি ও ওপরের বায়ুতে একই ধরনের উপাদান পাওয়া গেছে। আবার শক্তিশালী তাপমাত্রা বিপরীত স্তর বা ইনভার্শন বায়ুকে আটকে রাখায় তার ওপরে লবণ ও শর্করার পরিমাণ দ্রুত কমে যায়। বৃষ্টিসহ মেঘের মধ্যেও কিছু শর্করা ও অক্সালেটের পরিমাণ বেড়ে যেতে দেখা যায়।

গবেষকদের ধারণা, মেঘের অত্যন্ত আর্দ্র পরিবেশে রাসায়নিক বিক্রিয়া কিংবা অণুজীবের কার্যকলাপ এসব জৈব পদার্থকে পরিবর্তন করতে পারে। তবে গবেষণাটি সরাসরি প্রমাণ করেনি যে অণুজীবই অতিরিক্ত গ্লুকোজ তৈরি করেছে। রাসায়নিক বিক্রিয়া, মেঘের জলকণায় পরিবর্তন এবং বড় লবণকণার দ্রুত অপসারণ—এই সবই সম্ভাব্য কারণ।

গবেষণাটির পরিধিও সীমিত। মাত্র ১৪টি বেলুন নমুনা এবং তিনটি প্রধান আবহাওয়াগত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলে এই কণাগুলো বাস্তবে মেঘ, তুষারপাত বা সুমেরু অঞ্চলের উষ্ণায়নকে কতটা প্রভাবিত করে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে সুমেরু অঞ্চলের বরফ গলে খোলা সমুদ্রের পরিমাণ বাড়লে ভবিষ্যতে সমুদ্রের থেকেও বায়ুমণ্ডলে বেশি লবণ ও জৈব পদার্থ পৌঁছাতে পারে। তাই সমুদ্র থেকে আকাশে লবণ ও শর্করার এই যাত্রা জলবায়ু মডেলকে আরও নির্ভুল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।

সূত্র: https://www.earth.com/earth-science/sugars-from-the-ocean-are-reaching-clouds-high-above-the-arctic/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine − 2 =