মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্যের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রজার পেনরোজ বারবার ফিরে গেছেন গণিতের কাছে। কৃষ্ণগহ্বরের জন্ম, মহাবিশ্বের সূচনা, স্থান-কালের প্রকৃতি কিংবা মানুষের চেতনা- বিষয়গুলি আলাদা, কিন্তু তাঁর অনুসন্ধানের কেন্দ্রে ছিল একটিই প্রশ্ন: প্রকৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকা নিয়মগুলি আসলে কীভাবে কাজ করে?
এই অসাধারণ যাত্রার শুরু ১৯৩১ সালের ৮ আগস্ট। রজার পেনরোজের বাবা লিওনেল শার্পলস পেনরোজ ছিলেন জিনতত্ত্ববিদ চিকিৎসক, রয়্যাল সোসাইটির ফেলো। মা মার্গারেট লিদেসও ছিলেন চিকিৎসক। পরিবারে অবশ্য শুধু রজারই অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন না। তাঁর বড় ভাই অলিভার পেনরোজও গণিতের অধ্যাপক ছিলেন। ছোট ভাই মনোবিজ্ঞানের প্রভাষক এবং এক স্বভাব প্রতিভাধর দাবাড়ু।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় পেনরোজ পরিবার দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যায়। সেখানেই রজারের স্কুলজীবন শুরু। গণিতের প্রতি তাঁর প্রথম আকর্ষণ কিন্তু স্কুলের পাঠ্যবই থেকে আসেনি, এসেছিল বাড়ির পরিবেশ থেকে। তাঁর বাবা-মা দুজনেই ছিলেন জ্যামিতিপ্রেমী। পারিবারিক আলোচনার মধ্যেই ছোট রজারের মনে গণিতের প্রতি কৌতূহলের জন্ম হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৪৫ সালে তাঁরা ইংল্যান্ডে ফিরে আসে। রজার ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি কলেজ স্কুলে। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, তিনিও বাবার মতো চিকিৎসাবিজ্ঞানের পথে যাবেন। কিন্তু স্কুলে যখন জীববিজ্ঞান ও গণিতের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হল, তিনি নির্দ্বিধায় বেছে নেন গণিত।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন থেকে তিনি গণিতে প্রথম শ্রেণির সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে বিশুদ্ধ গণিতে গবেষণার জন্য আসেন কেমব্রিজের সেন্ট জনস কলেজে। সেখানে বীজগাণিতিক জ্যামিতিতে গবেষণা শুরু করেন বিখ্যাত গণিতবিদ হজ-এর তত্ত্বাবধানে। কিন্তু এক বছর পরই বুঝতে পারেন, তাঁর আগ্রহের বিষয়বস্তু হজের গবেষণার মূলধারার সঙ্গে মিলছে না। তখন তত্ত্বাবধায়ক বদলে জন টড-এর অধীনে গবেষণা চালিয়ে যান। এই সময়েই তাঁর জীবন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়। বীজগণিত ও জ্যামিতিতে গবেষণা করে ১৯৫৭ সালে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ ডি ডিগ্রি অর্জন করেন বটে, কিন্তু ততদিনে তাঁর মন পদার্থবিজ্ঞানের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কেমব্রিজে প্রথম বছরে তিনি যে তিনটি কোর্স পড়েছিলেন, সেগুলোই তাঁর চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলে। আর এই আগ্রহের প্রথম ও প্রধান প্রেরণা ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী ডেনিস সিয়ামা, যিনি তাঁর ভাই অলিভারের বন্ধু ছিলেন। পিএইচ ডি গবেষণার পাশাপাশি কেমব্রিজে থাকাকালীন রজার পেনরোজ সেমিগ্রুপ এবং ম্যাট্রিক্স-রিং নিয়ে একাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি “এ জেনারালাইজড ইনভার্স ফর ম্যাট্রিসেস” শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশ করেন কেমব্রিজ ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির জার্নালে। ম্যাট্রিক্সের এই সাধারণীকৃত বিপরীত ধারণাটি পরবর্তীতে বহু গাণিতিক সমস্যার সমাধানে ব্যবহৃত হয়েছে। আজও এটি ‘মূর-পেনরোজ ইনভার্স’ নামে গণিতের একটি মৌলিক হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত। ১৯৫৬–৫৭ সালে বেডফোর্ড কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করার পর তিনি কেমব্রিজ, প্রিন্সটন, সিরাকিউজ, কিংস কলেজ লন্ডন ও টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতা করেন। গণিত থেকে মন দেন অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে। সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের জটিল দেশ-কালকে বিশ্লেষণের জন্য তৈরি করেন নতুন এক গাণিতিক পদ্ধতি। ১৯৬০-এর দশকের এই কাজই তাঁকে নিয়ে যায় কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রে। পেনরোজ দেখান, একটি বিশাল নক্ষত্র নিজের মহাকর্ষের চাপে ধসে পড়লে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই পতন থামানোর কোনো উপায় নাও থাকতে পারে। তৈরি হতে পারে সিঙ্গুলারিটি- স্থান-কালের এমন এক অনন্য অবস্থা, যেখানে প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানের ধারণাগুলি সংকটে পড়ে।
কৃষ্ণগহ্বরের সিঙ্গুলারিটি নিয়ে পেনরোজের কাজ তরুণ স্টিফেন হকিংকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। দুজনের মিলিত গবেষণায় দেখা যায়, একই ধরনের গাণিতিক যুক্তি মহাবিশ্বের অতীতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এর ফলে বিগ ব্যাং সিঙ্গুলারিটি সম্পর্কে আধুনিক ধারণার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয়। ১৯৬৯ সালে পেনরোজ প্রস্তাব করেন মহাজাগতিক সেন্সরশিপ অনুমান। সহজ ভাষায়, সিঙ্গুলারিটি সাধারণত ঘটনা দিগন্তর আড়ালে লুকিয়ে থাকবে—বাইরের পর্যবেক্ষক সরাসরি তার মুখোমুখি হতে পারবে না। একই সময়ে তাঁর ‘পেনরোজ প্রসেস’ দেখায়, ঘূর্ণায়মান কৃষ্ণগহ্বরের বিশেষ অঞ্চল থেকে শক্তি আহরণ করা নীতিগতভাবে সম্ভব।
পেনরোজের মন একটি বিষয়ের মধ্যে আটকে থাকেনি। ১৯৬৭ সালে তিনি প্রস্তাব করেন টুইস্টর তত্ত্ব, ১৯৭১ সালে স্পিন নেটওয়ার্ক এবং ১৯৭৪ সালে আবিষ্কার করেন পেনরোজ টাইলিং- যা হল অ-পুনরাবর্তনীয় এক গাণিতিক নকশা। পরে কোয়াসিক্রিস্টালের গঠনের সঙ্গে এর আশ্চর্য মিল পাওয়া যায়। তাঁর পেনরোজ ডায়াগ্রাম স্থান-কালের কার্য কারণ সম্পর্ককে সহজে বোঝানোর কাজে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে । ১৯৭৯ সালে তিনি পেশ করেন ওয়াইল বক্রতা অনুমান। এটি মহাবিশ্বের প্রাথমিক অবস্থা, মহাকর্ষীয় এনট্রপি ও সময়ের একমুখী প্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত।
১৯৮৯ সালে ‘দ্য এম্পেরর্স নিউ মাইন্ড’ বইয়ে পেনরোজ তাঁর অনুসন্ধানকে মহাবিশ্ব থেকে মানুষের মনের দিকে নিয়ে আসেন। তাঁর প্রশ্ন—চেতনা কি কেবল একটি জৈবিক কম্পিউটেশনের ফল? টিউরিংয়ের ‘হল্টিং প্রবলেম’ ও গ্যোডেলের ‘ইনকমপ্লিটনেস থিওরেম’-এর ওপর ভিত্তি করে তিনি যুক্তি দেন, মানুষের চিন্তার কিছু দিককে প্রচলিত অ্যালগরিদম দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা নাও যেতে পারে। পরে স্টুয়ার্ট হ্যামেরফের সঙ্গে তিনি প্রস্তাব করেন ‘অর্কেস্ট্রেটেড অবজেক্টিভ রিডাকশন’ তত্ত্ব। তাঁদের মতে, নিউরনের অতি ক্ষুদ্র নালিকাগুলি কোয়ান্টাম প্রক্রিয়ায় চেতনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তবে এই ধারণা এখনও বিতর্কিত এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
তাঁর অবদানের স্বীকৃতিও এসেছে ধারাবাহিকভাবে। পেয়েছেন অজস্র পুরস্কার। সর্বোচ্চ স্বীকৃতিটি আসে ২০২০ সালে। সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের একটি শক্তিশালী পূর্বাভাস হিসেবে কৃষ্ণগহ্বরের গঠন যে অনিবার্য হতে পারে- এই আবিষ্কারের জন্য তিনি পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারের অর্ধেক অংশ লাভ করেন। বাকি অর্ধেক পান রেইনহার্ড গেনজেল ও আন্দ্রেয়া গেজ।
রজার পেনরোজের যাত্রা শুরু হয়েছিল পারিবারিক আলোচনার টেবিলে জ্যামিতির প্রতি এক শিশুর কৌতূহল থেকে। সেই কৌতূহল তাঁকে নিয়ে গেছে ম্যাট্রিক্সের জটিল সমীকরণ থেকে কৃষ্ণগহ্বর, সেখান থেকে মহাবিশ্বের সূচনা, এমনকি মানুষের চেতনার গভীরতম প্রশ্নে। ২০০৪ সালের ‘দ্য রোড টু রিয়্যালিটি’ থেকে তাঁর পুরো বৈজ্ঞানিক দর্শনের একটি ছবি পাওয়া যায়। মহাবিশ্ব যতই রহস্যময় হোক, তার গভীরে কোথাও না কোথাও গণিতের একটি সুসংগঠিত কাঠামো লুকিয়ে আছে। আর সেই কাঠামোটি খুঁজে চলাই যেন ছিল রজার পেনরোজের আজীবনের বিজ্ঞানযাত্রা।
