প্লাসেন্টার পাহারায় ভ্রূণ 

প্লাসেন্টার পাহারায় ভ্রূণ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ আগষ্ট, ২০২৬

একজন গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে যেকোনো রোগের চিকিৎসা করতে গেলেই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় – আচ্ছা ওষুধটি গর্ভস্থ শিশুর শরীরে পৌঁছে তার কোনো ক্ষতি করবে না তো? বিশেষ করে ক্যানসার, অটোইমিউন রোগ বা মাইগ্রেনের মতো দীর্ঘস্থায়ী অসুখে ব্যবহৃত কিছু মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি মায়ের শরীর থেকে প্লাসেন্টা/অমরা পেরিয়ে গর্ভস্থ শিশুর শরীরে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে মায়ের চিকিৎসার সুফলের পাশাপাশি ভ্রূণের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টিও বিবেচনা করতে হয়। নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অব অসলো ও হাসপাতাল এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা এই সমস্যার একটি সম্ভাব্য নতুন সমাধান দেখিয়েছেন। এতে মায়ের শরীরে ওষুধের দীর্ঘস্থায়ী কার্যকারিতাও বজায় থাকবে , আবার সেই ওষুধের অংশ ভ্রূণের কাছে কম পৌঁছাবে।

গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন, প্লাসেন্টা/অমরা রক্তের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনকে একইভাবে ব্যবহার করে না। এরা হল IgG অ্যান্টিবডি ও অ্যালবুমিন। দুটিই নিওনেটাল Fc রিসেপ্টর (FcRn) নামের একটি রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্লাসেন্টা এই দুই প্রোটিনকে সমানভাবে পার হতে দেয় না। প্লাসেন্টা IgG-কে সক্রিয়ভাবে ভ্রূণের দিকে পাঠালেও অ্যালবুমিনকে প্রায় আটকে রাখে। মূলত প্লাসেন্টার এই কার্যকারিতাকে হাতিয়ার করেই বিজ্ঞানীরা নতুন ধরনের জৈব-ওষুধ তৈরির চেষ্টা করেছেন। তাঁরা চিকিৎসায় ব্যবহৃত IgG অ্যান্টিবডির সঙ্গে অ্যালবুমিন জুড়ে দেন। এবার দেখা গেল, এই সংযুক্ত অ্যান্টিবডি রক্তে দীর্ঘসময় থাকলো, কিন্তু প্লাসেন্টা পেরিয়ে ভ্রূণের শরীরে প্রবেশ করার পরিমাণটা কমে গেল।

গবেষণাটি শুধু সাধারণ ইঁদুরের উপর নয়, জেনেটিকভাবে মানবসদৃশ বৈশিষ্ট্যযুক্ত ইঁদুর এবং প্রসবের পর দান করা মানব প্লাসেন্টার টিস্যুতেও পরীক্ষা করা হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষার ক্ষেত্রে মোটামুটি একই ফল পাওয়া যায়। IgG সহজে প্লাসেন্টা অতিক্রম করলেও অ্যালবুমিন তা পারে না। পরে গবেষকেরা অ্যালবুমিনের একটি পরিবর্তিত রূপ ব্যবহার করে দেখান যে অ্যান্টিবডির শরীরে থাকার সময় এবং প্লাসেন্টা অতিক্রমের মাত্রা প্রোটিনের নকশা পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

এরপর ইঁদুরের উপর FNAIT/ ফিটাল অ্যান্ড নিওনেটাল অ্যালোইমিউন থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া রোগের মডেলেও এই পদ্ধতি পরীক্ষা করা হয়। এই রোগ একপ্রকার গর্ভাবস্থাকালীন অস্বাভাবিকত্ব। এক্ষেত্রে মায়ের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এমন অ্যান্টিবডি তৈরি করে যা তার গর্ভস্থ শিশুর প্লেটলেটকে আক্রমণ করে। এর ফলে শিশুর প্লেটলেট সংখ্যা কমে যায় এবং গুরুতর রক্তপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আগের ভিন্নধর্মী ইঁদুরের পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল নতুনভাবে তৈরি অ্যান্টিবডি ব্যবহার করলে ভ্রূণের ওষুধ-সংস্পর্শ এবং তার সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তাই FNAIT-এর ক্ষেত্রেও একই আশা নিয়ে এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করা হয়। এবং এক্ষেত্রেও দেখা গেল, গবেষণায় তৈরি অ্যান্টিবডি ব্যবহার করলে ভ্রূণের ওষুধ-সংস্পর্শ এবং পরবর্তী ক্ষতিকর প্রভাব দুটিই কমে যায়।

গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার একটা নতুন ওষুধ তৈরির পদ্ধতির পাশাপাশি প্লাসেন্টা কীভাবে মায়ের রক্তের উপাদান বেছে নেয়, সে সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিয়েছে। ভবিষ্যতে এই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে গর্ভাবস্থায় ব্যবহারের উপযোগী আরও নিরাপদ জৈব-ওষুধ তৈরি হতে পারে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনও প্রয়োজন আরও বিস্তৃত গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো এমন জৈব-ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হবে, যা একাধারে মায়ের রোগ নিয়ন্ত্রণ করবে, দীর্ঘসময় কার্যকর থাকবে এবং একই সঙ্গে গর্ভস্থ শিশুর কাছে ওষুধের ক্ষতিকর প্রভাব পৌঁছনো অনেকটাই কমিয়ে দেবে।

সূত্র: Fetus with DNA umbilical cord Albumin-Fused Antibodies May Reduce Fetal Exposure to Therapeutics August 17, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 1 =