নেপালে ধ্বংসলীলা : কেউ একলা দায়ী নয়

নেপালে ধ্বংসলীলা : কেউ একলা দায়ী নয়

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

২৬ আগস্টের নেপাল-তিব্বত সীমান্তের প্রাকৃতিক ধ্বংসলীলাকে এখনও প্রচলিত হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা (GLOF) বলা যাচ্ছে না। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এটি ছিল একাধিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতার পরিণাম। পাহাড় ধসে পড়া, সেই ধস দ্রুত নীচে নেমে আসা, পথে মাটি-পাথর-বরফ মিশে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত বহু দূর পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনা। সুতরাং হিমালয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে জ্ঞান বাড়লেও সেই জ্ঞানকে কার্যকর সিদ্ধান্তে রূপান্তর করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। হিমবাহের পশ্চাদপসরণ, অস্থিতিশীল ঢাল, অপরিকল্পিত নির্মাণ ও নদী-করিডরে বসতি, সব মিলিয়ে ঝুঁকি বাড়ছে। তবে কোনও নির্দিষ্ট রাস্তা, বাড়ি বা গাছ কাটাকে এই ধসের সরাসরি কারণ বলা এখনই বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিসঙ্গত নয়। একইভাবে প্রতিটি হিমালয়-দুর্যোগকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলাও ঠিক নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন যে এই ভৌত পরিবেশকে বদলে দিচ্ছে, তা উপেক্ষা করা যায় না। ২০১১–২০২০ সময়ে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের ভরহ্রাস আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হয়েছে, বরফ গলা ও পারমাফ্রস্টের পরিবর্তনও পাহাড়ের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে। রাস্তা নির্মাণে পাহাড় কাটা, নদীর কাছাকাছি অপরিকল্পিত বসতি, অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, গাছ কাটা, অপরিকল্পিত রাস্তা ও সরু উপত্যকায় নির্মাণের ফলে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে। এই ঝুঁকি তৈরির জন্য কোনও একজন কেউ দায়ী নন। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, নির্মাতা, জলবিদ্যুৎ সংস্থা ও সাধারণ মানুষের নানা সিদ্ধান্ত ঝুঁকি বাড়ায়। তবে সবার দায়ও সমান নয়। বড় প্রকল্পের সিদ্ধান্তে একটি গোটা এলাকার পরিবেশ বদলে যেতে পারে, আবার নদীর ধারে থাকা অনেক পরিবারের নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার সুযোগও কমে আসে। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘নির্মাণ নিষেধ’ নীতি কার্যকর করা, রাস্তা ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সম্মিলিত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সীমান্ত পেরিয়ে তথ্যর আদান-প্রদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্থানীয় স্তরেও শক্তিশালী ব্যবস্থা দরকার। স্থানীয় মানুষ, প্রশাসন, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে একই তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত মিলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে শুধু আলোচনা নয়, স্থানীয় মানুষকে বন রক্ষা বা নির্মাণে বিধিনিষেধ মানার জন্য আর্থিক সহায়তা, বিকল্প জীবিকা ও সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা কার্যকর হবে না। হিমালয়ের ঝুঁকি কোনও দেশের সীমায় থেমে থাকে না। তাই চীন, নেপাল ও ভারতের মধ্যে হিমবাহ, নদী ও পাহাড়ের পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান জরুরি। সেই তথ্য স্থানীয় মানুষের কাছেও সহজভাবে পৌঁছে দিতে হবে। তবে এটাও বাস্তব যে সব পাহাড়ধস ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও আগাম প্রস্তুতি থাকলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে অনেকটাই কমানো সম্ভব।

 

সূত্র: Down to Earth;August 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × two =