সমুদ্রপৃষ্ঠের রেকর্ড তাপমাত্রা  

সমুদ্রপৃষ্ঠের রেকর্ড তাপমাত্রা  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সাধারণত মার্চ–এপ্রিলেই সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছয়। কিন্তু এ বার সেই স্বাভাবিক ছন্দে ব্যতিক্রম ঘটেছে। ২০২৬ সালের আগস্টেই বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছুঁল সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২২ আগস্ট ২০২৬-এ ৬০° উত্তর থেকে ৬০° দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে, অর্থাৎ মেরু-অঞ্চল বাদে বিশ্বের অধিকাংশ মহাসাগরের গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ছিল ২১.১০৪° সে। এর আগে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ছিল ২১.০৯°C, যা ২০২৪ সালের ১ মার্চ নথিভুক্ত হয়েছিল। সমুদ্র সাধারণত দক্ষিণ গোলার্ধের গ্রীষ্মের পর, অর্থাৎ মার্চ–এপ্রিল নাগাদ সবচেয়ে উষ্ণ থাকে। নতুন এই রেকর্ড আগস্টের আগের সর্বোচ্চ তাপমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৩ সালের আগস্টে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিল ২০.৯৮°C। এই অস্বাভাবিক উষ্ণতার পিছনে কাজ করছে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তন এবং সাম্প্রতিক আবহাওয়াগত পরিস্থিতি-দুইয়েরই প্রভাব। কয়েক দশক ধরে মানুষের কর্মকাণ্ডে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ায় পৃথিবীর মহাসাগর ক্রমাগত অতিরিক্ত তাপ শোষণ করছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া শক্তিশালী এল নিনো। এই প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনাটি ইতিমধ্যেই উষ্ণ হয়ে থাকা সমুদ্রে আরও তাপ যোগ করছে। এই ক্রমবর্ধমান উষ্ণতার পেছনে রয়েছে দুটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি কারণের মিলিত প্রভাব। একদিকে দশক ধরে মানুষের কর্মকাণ্ডে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর মহাসাগর ক্রমাগত অতিরিক্ত তাপ শোষণ করছে। অন্যদিকে বর্তমানে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হচ্ছে একটি শক্তিশালী এল নিনো , যা হয়তো সমুদ্রের উষ্ণতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপীয় সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের জলবায়ু-বিষয়ক কৌশলগত প্রধান সামান্থা বার্গেসের মতে, “এর প্রভাব শুধু সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উষ্ণ জল তাপীয় প্রসারণের মাধ্যমে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায়। পাশাপাশি বাড়ে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ ও তার তীব্রতা। এর ফলে প্রবালপ্রাচীর, সিগ্রাসের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং অন্যান্য সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে”। উষ্ণ মহাসাগর বায়ুমণ্ডলেও বেশি তাপ ও জলবাষ্প সরবরাহ করে। ফলে কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টি এবং ঝড়ের তীব্রতা বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের দিনসংখ্যা ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার তুলনায় তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন বোঝাতে একটি তুলনাই যথেষ্ট। ১৯৭৯ সালের ২২ আগস্ট একই সমুদ্রাঞ্চলের গড় তাপমাত্রা ছিল মাত্র ২০.১৫°সে —২০২৬ সালের একই দিনের তুলনায় প্রায় এক ডিগ্রি কম। অর্থাৎ, সমুদ্রের এই নতুন রেকর্ড কেবল একটি সংখ্যার পরিবর্তন নয়। এটি পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় জমতে থাকা অতিরিক্ত তাপের আরও একটি স্পষ্ট সংকেত।

 

সূত্র: Downtoearth; August 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen + three =