ট্রমার অভিঘাত ও তার স্মৃতি 

ট্রমার অভিঘাত ও তার স্মৃতি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ট্রমার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে অনেকেই হোঁচট খান। কখনও ঘটনার কিছু অংশ মনে থাকে, কিছু অংশ হারিয়ে যায়, আবার কখনও স্মৃতিগুলি পরস্পরের সঙ্গে বেমানান হয়ে যায়। এর কারণ বুঝতে গেলে জানতে হবে, ট্রমা কিভাবে মস্তিষ্ক ও শরীরকে প্রভাবিত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ জীবনে কোনও না কোনও ট্রমাটিক ঘটনার মুখোমুখি হন। তাঁদের সবাই PTSD-তে আক্রান্ত হন না, তবে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, ঘুমের সমস্যা কিংবা তীব্র মানসিক অস্বস্তি অনেক সময়ই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ট্রমার মুহূর্তে ভয় ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অ্যামিগডালা অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে স্মৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ হিপোক্যাম্পাস তীব্র চাপের মধ্যে পড়ে। ফলে ঘটনা সবসময় একটি ‘গোছানো গল্প’ হিসেবে মস্তিষ্কে জমা হয় না। থেকে যায় কিছু ছবি, শব্দ, গন্ধ, শারীরিক অনুভূতি বা বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত। পরে কোনও পরিস্থিতি সেই স্মৃতিকে উসকে দিলে মনে হতে পারে, বুঝি ঘটনাটি অতীতের নয়, এই মুহূর্তেই আবার ঘটছে। তাই ট্রমার স্মৃতি অনেক সময় সরলরৈখিক হয় না। ট্রমার প্রতিক্রিয়া বলতে আমরা সাধারণত ‘লড়াই অথবা পালানো’ (fight or flight) বুঝি। কিন্তু অনেকেই ভয়ে স্থানু হয়ে যেতে পারেন, কথা বলতে না-ও পারেন। আবার কেউ এমন আচরণও করতে পারেন, যেন কিছুই ঘটেনি। ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবে কথা বলা কিংবা প্রয়োজনীয় কাজ সারা, সবই চলে স্বাভাবিক নিয়মে। বাইরে থেকে অস্বাভাবিক মনে হলেও এটি ‘ফন (fawn) রেসপন্স’ বা ধামাচাপা দেওয়ার প্রতিক্রিয়া হতে পারে। অর্থাৎ, যেন সব ঠিকঠাক আছে বলে অপর পক্ষকে শান্ত করে নিরাপদে সরে যাওয়ার চেষ্টা। তাই ঘটনার সময় কেউ শান্ত ছিলেন বা পরে স্বাভাবিক আচরণ করেছিলেন, তা দিয়ে ঘটনাটি ‘ঘটেনি’ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। একইভাবে, ট্রমার পরে বর্ণনায় অসঙ্গতিও অস্বাভাবিক নয়। প্রবল ভয়, আগের ট্রমার স্মৃতি মাথাচাড়া দেওয়া কিংবা চাপ, ঘটনার আসল স্মৃতিকে আরও খণ্ডিত করতে পারে। ফলে বর্ণনা হতে পারে বিচ্ছিন্ন, আবেগপ্রবণ বা কখনও অত্যন্ত নির্লিপ্ত। এই আচরণকে মিথ্যা বা বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব হিসেবে দেখলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যৌন নিগ্রহের মিথ্যা অভিযোগের হারও গবেষণায় তুলনামূলকভাবে কম- প্রায় ২ থেকে ১০ শতাংশ। তাই চিকিৎসা, আইনব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্র কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন ট্রমা-সচেতন দৃষ্টিভঙ্গির। অর্থাৎ বিচার না করে আগে বোঝার চেষ্টা করা, একজন মানুষ কি অনুভব করছেন এবং তাঁর মস্তিষ্ক ও শরীর কেন এমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। সহানুভূতি, ধৈর্য ও নিরাপদ পরিবেশের মাধ্যমে বিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি করতে হবে। তাতে কমতে পারে পুনরায় মানসিক আঘাতের ঝুঁকি। ট্রমার পরে যে আচরণ বাইরে থেকে অসংলগ্ন মনে হয়, তা অনেক সময় আসলে মস্তিষ্কের বেঁচে থাকার কৌশল।

সূত্র: The conversation; August; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 1 =