ছোটো ল্যাবে বড়ো গবেষণা 

ছোটো ল্যাবে বড়ো গবেষণা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আচ্ছা মহাবিশ্বে পদার্থ কেন প্রতিপদার্থের চেয়ে বেশি? পদার্থবিজ্ঞানের এই উত্তর এখনও অজানা। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা সাধারণত বিশাল কণা ত্বরণযন্ত্র বা পার্টিকল অ্যাক্সিলারেটর ব্যবহার করেন। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিশীতল তেজস্ক্রিয় অণু ব্যবহার করেও একই ধরনের মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষা করা সম্ভব। এতে ভবিষ্যতে বড় অ্যাক্সিলারেটরের বদলে বেশ ছোট গবেষণাগারেই নতুন পদার্থবিদ্যার অনুসন্ধান করা যেতে পারে।

গবেষণাটি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালটেক, জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় ও মিশিগান স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি দল। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল রেডিয়ামযুক্ত অণু তৈরি করে সেগুলোকে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় স্থিতিশীল করা। রেডিয়াম বিশেষভাবে আকর্ষণীয়, কারণ এর পরমাণুর কেন্দ্রকের আকৃতি অনেকটা নাশপাতির মতো। এই অসম আকৃতি কেন্দ্রকের ভেতরের খুব সামান্য পরিবর্তনকেও শনাক্ত করা সহজ করে তুলতে পারে।

গবেষকদের মতে, কোনো পরমাণু বা অণুর ইলেকট্রন যখন নিউক্লিয়াসের কাছাকাছি থাকে, তখন নিউক্লিয়াসের আকার ও গঠনের সামান্য পরিবর্তন ইলেকট্রনের শক্তিস্তরেও ক্ষুদ্র পরিবর্তন ঘটাতে পারে। উচ্চ-নির্ভুলতার স্পেকট্রোস্কোপি বা আলোক-বর্ণালি বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই পরিবর্তন মাপা সম্ভব। এর সাহায্যে এমন কিছু মৌলিক প্রতিসাম্য ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে, যা বর্তমান প্রমাণ মডেলের বাইরের।

তবে রেডিয়াম অত্যন্ত তেজস্ক্রিয় ও রাসায়নিকভাবে সক্রিয় হওয়ায় এটি নিয়ে কাজ করা কঠিন। গবেষকরা এই সমস্যা সমাধানে একটি অভিনব পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তাঁরা অল্প পরিমাণ রেডিয়াম-২২৬-কে জাইলিটল নামের এক ধরনের মিষ্টিকারকের দ্রবণে প্রক্রিয়াজাত করে পরিবহনযোগ্য একটি পদার্থ তৈরি করেন। পরে সেটিকে সোনার পাতের ওপর স্থাপন করে তামার তৈরি একটি ক্রায়োজেনিক কক্ষে রাখা হয় এবং হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহার করে তাপমাত্রা মাত্র ৪ কেলভিনে নামিয়ে আনা হয়।

এরপর লেজারের সাহায্যে রেডিয়ামকে সক্রিয় করে হাইড্রক্সাইড, ডিউটেরক্সাইড ও ফ্লোরাইডের মতো পদার্থের সঙ্গে অণু তৈরি করা হয়। আশপাশের হিলিয়াম পরমাণুর সংঘর্ষের ফলে অণুগুলো আরও ঠান্ডা হয়ে অল্প কয়েকটি ঘূর্ণন ও কম্পনযুক্ত অবস্থায় পৌঁছায়। এই অবস্থায় গবেষকরা প্রথমবারের মতো রেডিয়ামযুক্ত অণুর উচ্চ-নির্ভুলতার স্পেকট্রোস্কোপিক বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হন।

তবে এটি এখনও প্রাথমিক ধাপ। ভবিষ্যতে অণুগুলোকে আরও ঠান্ডা করে অতিশীতল অবস্থায় আনা এবং লেজার দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। রেডিয়াম-২২৫ নিয়েও গবেষকেরা আগ্রহী, কারণ এর কেন্দ্রক নতুন পদার্থবিদ্যার সন্ধানে আরও সংবেদী হতে পারে। তবে এর অর্ধায়ু মাত্র ১৫ দিন, যেখানে রেডিয়াম-২২৬-এর অর্ধায়ু প্রায় ১,৬০০ বছর।

এই গবেষণা তেজস্ক্রিয় অণু নিয়ে নিরাপদ ও নির্ভুল পরীক্ষার নতুন পথ খুলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ছোট আকারের পরীক্ষাগার থেকেই প্রমাণ মডেলের বাইরের অজানা কণা, বল বা মৌলিক প্রতিসাম্য ভঙ্গের সন্ধান মিলতে পারে।

 

সূত্র: Atomic and molecular Research update Cold radioactive molecules offer a tabletop route to new physics, 28 Jul 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine − 8 =