সুমেরু মহাসাগরের সামুদ্রিক বরফ একবারের ঝড়ের ধাক্কা সামলে নিলেও, অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর একাধিক শক্তিশালী নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে বরফের পুনরুদ্ধার ক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়। জার্মানির আলফ্রেড ভেগনার ইনস্টিটিউট (AWI)-এর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক গবেষকদল এই ঘটনাকে সাইক্লোন ক্লাস্টারিং বা ঘূর্নিঝড়ের ক্রমিক পুঞ্জীভবন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গবেষণা সম্পর্কিত সম্পূর্ণ বিবরণটি প্রকাশিত হয়েছে নেচার কমিউনিকেশন্সে।
গবেষণায় ১৯৭৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আবহাওয়ার তথ্য ও উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকেরা এমন পরিস্থিতি শনাক্ত করার জন্য একটি আবহাওয়া-ব্যবস্থা অনুসরণকারী অ্যালগরিদম পরিবর্তন করেন, যাতে একই অঞ্চলে পরপর ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড়গুলোকে নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা যায়। এরপর প্রতিটি ঝড়ের আগে ও পরে সামুদ্রিক বরফের অবস্থার তুলনা করা হয়।
এই ঘূর্ণিঝড়গুলো মহাসাগরের বরফস্তরকে ভেঙে টুকরো করে দেয় এবং টুকরোগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে আরও ক্ষয়ে যায়। এরফলেই বরফের মধ্যে বড় বড় ফাটল তৈরি হয়। সাধারণত শীতকালে এসব ফাটল কয়েক দিনের মধ্যেই আবার জমে যায়। কিন্তু পরপর ঘূর্ণিঝড় এলে বরফ ক্রমাগত অস্থির থাকে এবং নতুন তৈরি ফাটলগুলো অনেক ক্ষণ খোলা থাকে। ফলে বরফের পুনরায় জমাট বাঁধার সুযোগটুকু কমে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, উষ্ণ মাসগুলোতে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি তুলনামূলক কম হলেও এগুলো স্থানীয়ভাবে বরফের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ঝড় বরফের খণ্ডগুলোকে উত্তরের দিকে ঠেলে দেয় এবং বিদ্যমান বরফের আঞ্চলিক সংকোচনের ফলে মোট বরফের আচ্ছাদন কমে যায়। পাশাপাশি এই ঝড় উষ্ণ বায়ু নিয়ে আসতে পারে এবং সমুদ্রের গভীরের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ জলকে পরিচলনস্রোতের মাধ্যমে ওপরে তুলে আনে, যেটা বরফ গলার প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে।
একটি সাইক্লোন পুঞ্জে গড়ে প্রায় ২.৫টি ঝড় থাকে। পুরো সুমেরু অঞ্চলে এ ধরনের ঝড়ের সমষ্টি একটি বিচ্ছিন্ন নিম্নচাপের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সমুদ্রবরফ কমায়, এর প্রভাব প্রায় ২.৫ গুণ বেশি সময় স্থায়ী হয়। অঞ্চলভেদে ক্ষতির মাত্রা আরও বেশি হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গত কয়েক দশকে এই ধরনের ঝড়ের কারণে বরফহানি বেশ ব্যাপকহারে বেড়েছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সুমেরুর বরফ ক্রমশ পাতলা ও বেশি চলনশীল হয়ে পড়ছে। ফলে দুর্বল বরফ পরপর ঝড়ের প্রকোপে পড়ে আরও সহজে ভাঙছে। আর বরফ কমে গেলে পরবর্তী ঝড়ের ক্ষতির প্রভাব আরও বাড়ে। বিষয়টা অনেকটা একটি স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া চক্রের মতো।
এই বরফহানি শুধু সুমেরু অঞ্চলের সমস্যা নয়। সামুদ্রিক বরফ ঢেউ ও ঝড়ের আঘাত থেকে উপকূলকে কিছুটা রক্ষা করে। বরফ সরে যাওয়া এবং ভূগর্ভস্থ চিরহিম বরফের স্তর গলতে থাকায় সুমেরু উপকূলীয় জনপদ ভবিষ্যতে আরও বেশি ঝড়, ঢেউ ও ক্ষয়ের মুখে পড়তে পারে।
অর্থাৎ, শুধু বিশ্বউষ্ণায়ন নয়, পরপর আঘাত হানা ঝড়ও সুমেরুর পরিবর্তনের অন্যতম কারন।
সূত্র: “On the relevance of serial cyclone clustering for Arctic sea ice” by Lars Aue, Sofie Tiedeck, Peter Finocchio, Timo Vihma, Petteri Uotila, Gunnar Spreen and Annette Rinke, 5th August 2026, published in Nature Communications. DOI: 10.1038/s41467-026-76245-5
