‘লিপ সেকেন্ড, না লিপ আওয়ার?’

‘লিপ সেকেন্ড, না লিপ আওয়ার?’

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

লিপ ইয়ারের খবর আমরা জানি। কিন্তু লিপ সেকেন্ড? এক সেকেন্ডের হিসাবেই বদলে যেতে পারে কম্পিউটারের সম্পূর্ণ ব্যবস্থা! পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে পারমাণবিক ঘড়ির সময়ের সামঞ্জস্য রাখতে ১৯৭২ সাল থেকে মাঝেমধ্যে ঘড়িতে এক সেকেন্ড যোগ করা হয়। তাকেই বলা হয় লিপ সেকেন্ড। সেই লিপ সেকেন্ড ব্যবস্থা এবার নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কারণ, পৃথিবীর ঘূর্ণন দ্রুততর হওয়ায় ভবিষ্যতে একটি ‘নেগেটিভ লিপ সেকেন্ড’ তৈরি হবে। তখন যোগ করার বদলে সেই বাড়তি এক সেকেন্ড বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এতে গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। ১৯৭০-এর দশক থেকে এখনও পর্যন্ত ২৭ বার লিপ সেকেন্ড যোগ করা হয়েছে। শেষবার হয়েছে ২০১৬ সালে। পারমাণবিক ঘড়ির ভিত্তিতে তৈরি সমন্বিত বিশ্বসময়কে পৃথিবীর পরিবর্তনশীল ঘূর্ণনের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে রাখাই এর উদ্দেশ্য। সমস্যা হল, মাত্র এক সেকেন্ডের এই পরিবর্তন কম্পিউটার-নির্ভর ব্যবস্থায় বড় গোলযোগ তৈরি করতে পারে। বিদ্যুৎ গ্রিড, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন এবং ইন্টারনেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো সঠিক সময়ের সমন্বয়ের উপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে বিভিন্ন সংস্থা এই লিপ সেকেন্ড সমস্যা সামলায় ভিন্ন ভিন্ন পন্থায়। কেউ অতিরিক্ত এক সেকেন্ডকে ধীরে ধীরে সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়, কেউ নির্দিষ্ট মিনিটে এক সেকেন্ড যোগ করে। ফলে একই সময়ে ব্যবহৃত সময়-ব্যবস্থায় তৈরি হয় অসামঞ্জস্য। দীর্ঘ সময়ের হিসাবে চাঁদের মহাকর্ষীয় প্রভাবে পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর হচ্ছে। কিন্তু কয়েক বছর বা দশকের হিসাবে সেই গতি ওঠানামা করে। ২০১৫ সালের কাছাকাছি সময় থেকে পৃথিবীর ঘূর্ণন কিছুটা দ্রুত হয়েছে, যার সম্ভাব্য কারণ পৃথিবীর তরল কেন্দ্রের স্রোতের পরিবর্তন। এই প্রবণতা বজায় থাকলে ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে নেগেটিভ লিপ সেকেন্ডের, অর্থাৎ সমন্বিত বিশ্বসময় থেকে প্রথমবারের মতো এক সেকেন্ড বাদ দিতে হতে পারে। এতে গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার ব্যবস্থায় ব্যয়বহুল ও জটিল সমস্যা তৈরি হতে পারে। এই ঝুঁকি এড়াতে লিপ সেকেন্ডের বদলে ‘লিপ আওয়ার’ চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সময়ের সামান্য ব্যবধান বারবার সংশোধন না করে, পারমাণবিক সময় ও পৃথিবীর ঘূর্ণনভিত্তিক সময়ের মধ্যে ৩,৬০০ সেকেন্ড বা এক ঘণ্টা ব্যবধান তৈরি হলে একবারে সমন্বয় করা। ফলে এমন সংশোধনের প্রয়োজন কয়েকশো, এমনকি কয়েক হাজার বছরেও নাও হতে পারে। ফ্রান্সে ১৩–১৫ অক্টোবর ওজন ও পরিমাপের সাধারণ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলি এ বিষয়ে ভোট দেবে। প্রস্তাব পাশ হলে ২০ মে ২০২৭ থেকে লিপ সেকেন্ড বন্ধ হবে। তবে এর আগে আর লিপ সেকেন্ড যোগ করার সুযোগ না থাকায় পরিবর্তনটি কার্যত অবিলম্বেই কার্যকর হবে। প্রস্তাবটি নিয়ে অবশ্য সব দেশের সমর্থন নাও মিলতে পারে। রাশিয়ার GLONASS লিপ সেকেন্ডকে সময় গণনায় অন্তর্ভুক্ত করে, কিন্তু GPS-এর মতো কিছু ব্যবস্থা তা করে না। তাই GLONASS-কে নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন করতে হবে। অন্যদিকে, পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সমন্বিত বিশ্বসময়-এর সামঞ্জস্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের কাজে গুরুত্বপূর্ণ বলে অতীতে লিপ সেকেন্ড বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তবে এবার বড় কোনও আপত্তি এখনও শোনা যায়নি। ফলে সময় গণনায় এক সেকেন্ডের ঘনঘন সংশোধনের বদলে ভবিষ্যতে এক ঘণ্টার বড় সমন্বয়ের পথেই হয়তো এগোতে পারে বিশ্ব।

 

সূত্র: nature .com; August 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − twelve =