ভাবুন, একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চারটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্ট কাজ করছে। একজন রোগীর উপসর্গ বিশ্লেষণ করছে, অন্যজন অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিচ্ছে, তৃতীয়জন বিমার বিষয় সামলাচ্ছে, আর চতুর্থজন ব্যবস্থা করছে ওষুধের। প্রত্যেকেই নিজের ক্ষেত্রে দক্ষ। কিন্তু সমস্যা একটাই, তারা একসঙ্গে ভাবতে পারে না। তথ্য আদান-প্রদান হয়, কিন্তু সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিতে এখনও মানুষকেই মাঝখানে দাঁড়াতে হয়। সিসকোর আউটশিফটের বিজয় পাণ্ডের ভাষায়, “বুদ্ধিমত্তার অভাব নেই। অভাব এমন একটি ‘সংযোগকারী স্তরের’, যা আলাদা আলাদা এআই এজেন্টদের একটি দলে পরিণত করতে পারে”। এই ধারণাটাকে বলা হয় ‘ইন্টারনেট অব কগনিশন’। ‘ইন্টারনেট অব এজেন্টস’ এমন একটি ব্যবস্থা, যা এই এআইগুলিকে একে অপরকে খুঁজে পেতে, পরিচয় যাচাই করতে এবং তথ্য আদান-প্রদান করতে সাহায্য করবে। অর্থাৎ, কে কোথায় আছে এবং কার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে, সেটা ঠিক করবে। ‘ইন্টারনেট অব কগনিশন’ তার পরের ধাপ। অর্থাৎ, ‘ইন্টারনেট অব এজেন্টস’ এআইদের একে অপরের সঙ্গে কথা বলাবে, আর ‘ইন্টারনেট অব কগনিশন’ তাদের একটাই দলের মতো একসঙ্গে ভাবতে শেখাবে। এতদিন এআইয়ের উন্নতির মূল মন্ত্র ছিল খাড়াখাড়ি প্রসারণ, আরও বড় মডেল, আরও তথ্য, আরও কম্পিউটিং শক্তি। এখন প্রয়োজন অনুভূমিক প্রসারণ, অনেকগুলি এআইকে একসঙ্গে কাজ করানো। বিষয়টি সহজ নয়। সাতটি উন্মুক্ত-উৎসের বহু-এজেন্ট ব্যবস্থা নিয়ে একটি গবেষণায় ব্যর্থতার হার ৪১ থেকে প্রায় ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত। কারণ এজেন্টরা কাজ ভাগ করে নিতে পারলেও এমন কোনও অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে যুক্তি সাজাতে পারে না, যার সমাধান তারা কেউ আগে শেখেনি। পাণ্ডের মতে, “সমস্যাটি নির্দেশ দেওয়ার কৌশলের নয়, সমস্যা স্থাপত্যেই। সঠিক সমন্বয় স্তর না থাকলে অনেকগুলো এআই মিলে একটি এআইয়ের চেয়েও খারাপ ফল দিতে পারে”। এই ঘাটতি মেটাতে আউটশিফট তৈরি করেছে এজিএনটিসিওয়াই নামক একটি উন্মুক্ত-উৎস ব্যবস্থা, যা এখন লিনাক্স ফাউন্ডেশনের অধীনে। এর লক্ষ্য বিভিন্ন সংস্থা ও প্ল্যাটফর্মের এআই এজেন্টদের একই নেটওয়ার্কে এনে তাদের উদ্দেশ্য, তথ্য ও যুক্তি ভাগ করার সুযোগ দেওয়া। এই সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তার তিনটি স্তম্ভ :
ক. অভিন্ন উদ্দেশ্য- এজেন্টরা কাজ শুরুর আগে লক্ষ্য ঠিক করবে এবং মতবিরোধ মেটাবে। আউটশিফটের পরীক্ষায় এমন সমন্বয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাফল্য প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে ৯৩ শতাংশে উঠেছে।
খ. অভিন্ন প্রেক্ষিত- একটি যৌথ স্মৃতি ও তথ্যভাণ্ডার তৈরি হবে। এর ফলে প্রতিটি নতুন কাজের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের জ্ঞান আরও সমৃদ্ধ হবে, কেঁচে গণডূষ করতে হবে না।
গ. অভিন্ন যুক্তি ও নিরাপত্তা- এজেন্টরা একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেবে, তবে নিরাপত্তা, খরচ ও আইন মেনে চলার জন্য থাকবে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনমতো মানুষের হস্তক্ষেপ। কারণ ঝুঁকিও কম নয়। ভুল এজেন্টকে কাজ দিয়ে দেওয়া, ক্ষতিকর নির্দেশ ঢুকিয়ে দেওয়া, স্মৃতি বিকৃত করা কিংবা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তথ্য ও অনুমতি দিয়ে দেওয়া, সবই সম্ভব। যন্ত্রের গতিতে ভুল করলে তার ক্ষতিও হতে পারে যন্ত্রের গতিতেই। এই কারণেই আউটশিফট তৈরি করেছে নিরবচ্ছিন্ন এজেন্ট-সেম্যান্টিক অনুমোদন ব্যবস্থা। এটি শুধু এজেন্টের পরিচয় বা ভূমিকা দেখে অনুমতি দেবে না, বরং প্রতিটি কাজ তার আসল উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিলছে কি না, তা যাচাই করবে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার উদাহরণই ধরা যাক। কোনও এজেন্টকে একজন রোগীর নথি সংক্ষেপ করতে বলা হলে সে যদি পুরো হাসপাতালের তথ্যভাণ্ডার খুঁজতে শুরু করে, সেই অনুরোধ আটকে দিতে পারে এই ব্যবস্থা। পাণ্ডের বক্তব্য, এআই এখন একক ‘প্রতিভা’ থেকে ধীরে ধীরে একটি সম্মিলিত বুদ্ধিব্যবস্থায় পা রাখছে। পরবর্তী বড় লাফটি হয়তো হবে আরও বড় মডেল তৈরির দিকে নয়, এই এআইগুলিকে কীভাবে একসঙ্গে ভাবতে শেখানো যায়, সেই অভিমুখে।
সূত্র: MIT Technology Review; Physics World . com September 2026
