প্রাচীন গুহায় শুধুই নারী সমাধি 

প্রাচীন গুহায় শুধুই নারী সমাধি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দক্ষিণ আফ্রিকার রাইজিং স্টার গুহা-ব্যবস্থার জটিল রহস্যভেদ করতে গিয়ে গবেষকদের হামাগুড়ি দিয়ে পেরোতে হয়েছিল মাত্র কয়েক ইঞ্চি চওড়া অন্ধকার পথ। ২০১৩ সালে প্যালিওঅ্যানথ্রোপোলজিস্ট অধ্যাপক লি আর. বার্জার এমন একটি বিশেষ দল গঠন করেন, যারা জীবাশ্মবিদ্যার পাশাপাশি গুহায় চলাচলেও দক্ষ এবং শারীরিকভাবে ছোট। ছয়জন নারী গবেষক শেষ পর্যন্ত সেই দুঃসাহসিক অভিযানে অংশ নেন। তাঁদের নাম দেওয়া হয় ‘আন্ডারগ্রাউন্ড অ্যাস্ট্রোনট’।

তাঁরা পৌঁছেছিলেন রাইজিং স্টার গুহার ডিনালেডি কক্ষে। সেখানে পাওয়া যায় প্রায় ৩ লক্ষ বছর আগের এক অজানা মানবগোষ্ঠীর অসংখ্য দেহাবশেষ। পরে এই প্রজাতির নাম রাখা হয় হোমো নালেদি।

এই এইচ.নালেদি ছিল বিবর্তনের ইতিহাসে এক অদ্ভুত সন্ধিকালের মতো। তারা দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটত, তাদের হাত ও মুখে আধুনিক মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল, অথচ তাদের মাথার খুলি ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট, যা অনেক বেশি প্রাচীন মানবগোষ্ঠী অসট্রালোপিথেকাসের সমতুল্য।

কিন্তু এত বছর ধরে একটি প্রশ্ন গবেষকদের বিশেষভাবে ভাবাচ্ছিল । কেন এই প্রজাতির পুরুষ ও নারীর মধ্যে শারীরিক পার্থক্য এত কম?

নতুন গবেষণা সেই রহস্যের একটি সম্ভাব্য উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এই গবেষণার বিষয় বৃত্তান্ত সেল জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। দেখা গেছে, বিজ্ঞানীরা এবার হাড়ের আকৃতির বদলে দাঁতের ভেতরে থাকা প্রোটিনের দিকে নজর দেন। দাঁতের এনামেল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অ্যামিলোজেনিন প্রোটিনের X ও Y—দুটি ভিন্ন রূপ রয়েছে। সাধারণত পুরুষদের দাঁতে উভয় ধরনের প্রোটিনের উপস্থিতি দেখা যায়। কিন্তু পরীক্ষা করা এইচ. নালেদির কোনও দাঁতেই অ্যামিলোজেনিন -Y-এর চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

এর ফলে গবেষকদের ধারণা, ডিনালেডি চেম্বারে পাওয়া দেহাবশেষগুলো সম্ভবত সবই নারীর। আর এখানেই আবিষ্কারটির রহস্যময়তা। কারণ চেম্বারে শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের দেহাবশেষ নয়, শিশুদের দেহাবশেষও পাওয়া গেছে। গবেষকদের অনুমান , এই দেহগুলো স্বাভাবিকভাবে সেখানে জমা হয়নি; বরং এইচ.নালেদির সদস্যরা ইচ্ছাকৃতভাবে মৃতদের সেখানে নিয়ে গিয়ে রেখেছিল। এমনকি নারী সদস্যদের জন্য কোনো বিশেষ আচার বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রথাও থাকতে পারে।

এই ব্যাখ্যা সত্যি হলে মানববিবর্তনের ইতিহাসে এর গুরুত্ব হবে বিশাল। কারণ এই বিষয়টা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে, আধুনিক মানুষ বা নিয়ান্ডারথাল নয়, অন্য একটি প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর মধ্যেও মৃতদের নিয়ে পরিকল্পিত সামাজিক আচরণ ছিল।

অর্থাৎ, ডিনালেডি কক্ষ হয়তো শুধু কয়েক লক্ষ বছরের পুরোনো হাড়ের ভাণ্ডার নয়। এটি একটি হারিয়ে যাওয়া কৃষ্টির নিঃশব্দ সাক্ষীও বটে। এর মাধ্যমেই হয়তো আমরা বুঝতে পারবো মৃত্যু, সামাজিক সম্পর্ক এবং মৃতদের স্মরণ করার নিজস্ব কোনো রীতি ছিল কিনা।

 

সূত্র: https://www.cell.com/cell/fulltext/S0092-8674(26)00644-6

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 + 13 =