মানুষের অন্ত্রে থাকা অণুজীব বলতে গবেষণায় এত দিন মূলত ব্যাকটেরিয়ার দিকেই বেশি নজর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু খুব সম্প্রতি একটা গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, অন্ত্রে স্বাভাবিকভাবে থাকা একটি ছত্রাক শরীরকে বিকিরণজনিত ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। ছত্রাকটির নাম মিউকর রেসমোসাস।
গবেষকেরা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, বিকিরণের সংস্পর্শে আসার আগে বা পরে যেসব ইঁদুরকে এই ছত্রাক দেওয়া হয়েছিল, তাদের শরীরে ক্ষতির মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। অন্য ইঁদুরের তুলনায় তাদের ওজন কম কমেছে, প্রদাহের মাত্রা কম ছিল এবং কোষের অক্সিডেটিভ স্ট্রেসও কম দেখা গেছে। অর্থাৎ, বিকিরণের কারণে শরীরে যে ধরনের ক্ষতিকর পরিবর্তন হয়, ছত্রাকটি তার বিরুদ্ধে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।
ছত্রাকটিকে প্রথমে মানুষের অন্ত্রের মতো কম-অক্সিজেন যুক্ত পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া হলে এর প্রতিরোধক্ষমতা আরও বেড়ে যায়। এমনকি সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত ইঁদুরের শরীরেও এই ছত্রাক দেওয়ার পর বিকিরণজনিত ক্ষতির লক্ষণ কম দেখা যায়। এর অর্থ, অন্ত্রের অন্য কোনো জীবাণুর সাহায্য ছাড়াও মিউকর রেসমোসাস নিজে থেকেই কিছু সুরক্ষামূলক কাজ করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ছত্রাকটি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করে। যথা- L-গ্লুটামিক অ্যাসিড , L- অ্যাসপারটিক অ্যাসিড এবং DL-লাইসিন। এগুলো বিকিরণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত DNA মেরামত করতে এবং অন্ত্রের টিস্যু পুনর্গঠনে সাহায্য করে । ফলে বিকিরণের পর অন্ত্রের ক্ষত দ্রুত সেরে ওঠার একটা মোক্ষম সুযোগ তৈরি করছে এই ধরণের ছত্রাক।
এছাড়াও, এই ছত্রাকটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌগ তৈরি করে, যার নাম মিথাইল থায়ো অ্যাডেনোসিন। এটি অন্ত্রে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া লিমোসিল্যাক্টোব্যাসিলাস রিউটেরি -এর বৃদ্ধি ও কার্যকলাপকে প্রভাবিত করে। এর ফলে মিথিওনিন উৎপাদনও বাড়ে, যার ফলে শরীরের বিকিরণ প্রতিরোধক্ষমতাও বাড়ে।
গবেষকেরা বিষয়টি বাস্তব পরীক্ষাতেও যাচাই করেন। মিউকর রেসমোসাস দিয়ে গাঁজানো চিজ ইঁদুরকে খাওয়ানোর পর বিকিরণের সংস্পর্শে তাদের অন্ত্রের প্রতিরক্ষামূলক আবরণ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল এবং প্রদাহের সূচকও কম দেখা যায়।
মিউকর রেসমোসাস কিছু গাঁজানো খাবারে স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া যায় এবং খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য এর অনুমোদনও রয়েছে। তবে যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
অন্ত্রের ছত্রাক শুধু জীবাণু হিসেবে উপস্থিত নয়, তারা কখনো কখনো শরীরের সুরক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভবিষ্যতে এই আবিষ্কার ক্যানসারের রেডিয়েশন থেরাপি কিংবা অতিরিক্ত বিকিরণের সংস্পর্শে আসা পরিস্থিতিতে অন্ত্র ও শরীরকে সুরক্ষিত রাখার নতুন উপায় তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত ফলাফল মূলত ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা ভিত্তিতে এসেছে। মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সূত্র: https://www.sciencealert.com/scientists-find-a-fungus-that-could-protect-the-body-from-radiation
