হিরোশিমার বিস্ফোরণ থেকে উদ্ভূত হিরোশিমাইট 

হিরোশিমার বিস্ফোরণ থেকে উদ্ভূত হিরোশিমাইট 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এক ঘটনা। সেই বিস্ফোরণে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হন এবং শহরের প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যায়। সেই বিপর্যয়ের চরম তাপ ও চাপের মধ্যে এমন কিছু পদার্থ তৈরি হয়েছিল, যা স্বাভাবিক পৃথিবীতে আগে কখনো দেখা যায়নি। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা হিরোশিমার সেই ধ্বংসাবশেষের একটি কণায় সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক ধাতব সংকর শনাক্ত করেছেন।

ঘটনাটি বুঝতে হলে আমাদের প্রথমেই ফিরে যেতে হবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের মুহূর্তে। বোমাটি হিরোশিমা শহরের প্রায় ৫৮০ মিটার ওপরে বিস্ফোরিত হয়েছিল। বিস্ফোরণের ফলে তৈরি হয় বিশাল এক অগ্নিগোলক, যার তাপমাত্রা ৭০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ছিল। এত প্রচণ্ড তাপে শহরের বাড়িঘর, ধাতু, মাটি, জল এবং আশপাশের অন্যান্য উপাদান বাষ্পে পরিণত হয়।

এই অত্যন্ত উত্তপ্ত ও অস্থির পরিবেশে বিভিন্ন পদার্থ একসঙ্গে মিশে যায়। পরে অগ্নিগোলকটি দ্রুত ঠান্ডা হতে শুরু করলে সেই বাষ্পের উপাদানগুলো আবার ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। মাইক্রোমিটার থেকে মিলিমিটার আকারের এই কাচের মতো কণাগুলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৃষ্টির মতো মাটিতে ও হিরোশিমা উপসাগরের আশপাশে জমা হয়। এসব বিশেষ কণাকে বিজ্ঞানীরা ‘হিরোশিমাইট’ নামে চিহ্নিত করেছেন।

হিরোশিমাইটের বেশিরভাগ অংশে ক্যালসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম ও সিলিকন রয়েছে। তবে এগুলোর মধ্যে আরও নানা ধরনের পদার্থ মিশে থাকতে পারে। ইতালির ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ববিদ লুকা বিন্দি এবং তাঁর সহকর্মীরা এই ধরনের একটি কণার ভেতরেই নতুন ধাতব সংকরটির সন্ধান পেয়েছেন।

আবিষ্কৃত ধাতব অংশটি অবিশ্বাস্য রকমের ছোট। এর আকার মাত্র প্রায় এক মাইক্রোমিটার। অর্থাৎ, এটি মানুষের চুলের পুরুত্বের তুলনায়ও বহু গুণ ছোট। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি ছয়টি ধাতু ও সিলিকনের একটি সমজাতীয় মিশ্রণ। কিন্তু শুধু বিভিন্ন উপাদানের মিশ্রণই এর একমাত্র বিশেষত্ব নয়। এর ভেতরের পরমাণুগুলো যেভাবে সাজানো রয়েছে, অর্থাৎ এর কেলাসাকার কাঠামো, সেটিও খুবই অস্বাভাবিক।

গবেষকরা এক্স-রে বিচ্ছুরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে পদার্থটির অভ্যন্তরীণ গঠন পরীক্ষা করেন। এতে দেখা যায়, সংকরটির এমন একটি অস্বাভাবিক কেলাস কাঠামো রয়েছে, যা আগে কোনো পরিচিত পদার্থে দেখা যায়নি। একই সঙ্গে এতে সিলিকনের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে বেশি। এই দুটি বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা এটিকে একটি নতুন ও অদেখা পদার্থ হিসেবেই শনাক্ত করেছেন।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, পারমাণবিক বিস্ফোরণের সময় বিভিন্ন উৎস থেকে আসা ধাতব পদার্থ প্রচণ্ড উত্তাপে বাষ্পে পরিণত হয়েছিল। সেই ধাতব বাষ্প ও সিলিকন একসঙ্গে মিশে একটি জটিল বাষ্পীয় মিশ্রণ তৈরি করে। এরপর বিস্ফোরণের অগ্নিগোলক যখন খুব দ্রুত ঠান্ডা হতে থাকে, তখন সেই বাষ্প থেকে অত্যন্ত ছোট একটি ধাতব ফোঁটা তৈরি হয়।

তাপমাত্রা আরও দ্রুত কমে যাওয়ায় ফোঁটাটি মুহূর্তের মধ্যে শক্ত হয়ে যায়। সাধারণ পরিস্থিতিতে ধাতুর পরমাণুগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের সবচেয়ে স্থিতিশীল ও পরিচিত কেলাস কাঠামোতে সাজিয়ে নেয়। কিন্তু এখানে পরমাণুগুলো এত দ্রুত ঠান্ডা হয় যে তারা সেই স্বাভাবিক অবস্থায় পৌঁছানোর সুযোগ পায়নি। ফলে একটি অর্ধ-স্থিতিশীল অস্বাভাবিক কাঠামো সেখানে জমে যায়।

বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে এক ধরনের অতিদ্রুত শীতলীকরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ, বিস্ফোরণের পর পদার্থ এত দ্রুত ঠান্ডা হয়েছিল যে তার ভেতরের অস্বাভাবিক গঠন স্থায়ীভাবে আটকে যায়।

লুকা বিন্দির মতে, হিরোশিমার পারমাণবিক অগ্নিগোলককে এক অর্থে একটি দৈত্যাকার দুর্ঘটনাজনিত উপাদান বিজ্ঞানের গবেষণাগার বলা যেতেই পারে। কারণ এমন চরম তাপমাত্রা, চাপ এবং দ্রুত শীতল হওয়ার পরিবেশ সাধারণ পরীক্ষাগারে তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে এই ধ্বংসাবশেষ বিজ্ঞানীদের এমন কিছু পদার্থ সম্পর্কে জানার সুযোগ দিচ্ছে, যা স্বাভাবিক পরিবেশে তৈরি হওয়াই কঠিন।

এটি অবশ্য বিন্দি ও তাঁর সহকর্মীদের পারমাণবিক বিস্ফোরণের ধ্বংসাবশেষ থেকে নতুন পদার্থ আবিষ্কারের প্রথম ঘটনা নয়। কয়েক বছর আগে একই গবেষক দলের সদস্যরা নিউ মেক্সিকোর ১৯৪৫ সালের ট্রিনিটি পারমাণবিক পরীক্ষায় তৈরি ট্রিনিটাইট নামক কাচের মতো পদার্থের মধ্যে একটি নতুন কোয়াসিক্রিস্টাল শনাক্ত করেছিলেন।

হিরোশিমার নতুন সংকর ধাতুর আবিষ্কার একটি নতুন পদার্থের সন্ধানের পাশাপাশি, আরও একটা ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রকৃতির সবচেয়ে চরম ও ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতিতে পদার্থের আচরণ কতটা অপ্রত্যাশিত হতে পারে। একই সঙ্গে এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করছে, অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা এবং মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যাওয়া শীতলীকরণ কীভাবে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের পদার্থ ও কেলাসাকৃতি কাঠামো তৈরি করতে পারে। এই গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস-এ।

সূত্র: https://physicsworld.com/a/new-material-was-created-in-hiroshima-nuclear-explosion/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 + twelve =