কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কীটনাশকের ব্যবহার বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু ফসল রক্ষার এই রাসায়নিক কৃষকদের স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে। দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় ৪৬ শতাংশ কৃষক ও কৃষিশ্রমিক প্রতি বছর তীব্র কীটনাশক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন। ২০০৬ থেকে ২০২৩ সালের প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিচালিত এক গবেষণায় বছরে প্রায় ৪০.২–৪৩.৩ কোটি এমন বিষক্রিয়ার ঘটনা অনুমান করা হয়েছে।
গবেষণাটি পেস্টিসাইড অ্যাকশন নেটয়ার্কের উদ্যোগে পরিচালিত এবং ফ্রন্টিয়ার্স পাবলিক হেলথ পত্রিকায় প্রকাশিত । বিশ্বের প্রায় ৯৩.৪ কোটি কৃষক ও কৃষিশ্রমিকের হিসাব ধরে গবেষকেরা এই বিপুল সংখ্যাটি নির্ধারণ করেছেন। সবচেয়ে বেশি বিষক্রিয়ার ঘটনা অনুমান করা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়, এরপর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকায়। দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ আক্রান্তের হার বুরকিনা ফাসোতে, যেখানে প্রায় ৮৪ শতাংশ কৃষক ও কৃষিশ্রমিক কীটনাশক বিষক্রিয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
বিষক্রিয়ার প্রভাব শুধু অসুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১১ হাজার মানুষ কীটনাশক বিষক্রিয়ায় মারা যান, যার প্রায় ৬০ শতাংশ মৃত্যুই ঘটে ভারতে । ভারতের পেস্টিসাইড অ্যাকশন নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক জয়কুমার চেলাটন এই পরিস্থিতিকে এমন এক সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
কৃষকেরা আক্রান্ত হন মূলত কীটনাশক তৈরি ও প্রয়োগের সময়, কিংবা সদ্য কীটনাশক দেওয়া ফসল, দূষিত সরঞ্জাম ও পোশাক স্পর্শ করার মাধ্যমে । গবেষকেরা তীব্র বিষক্রিয়া বলতে রাসায়নিকের সংস্পর্শে অল্প সময়ের মধ্যে দেখা দেওয়া অসুস্থতা বা শারীরিক প্রতিক্রিয়াকে বুঝিয়েছেন।
আবার, কীটনাশকের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিও যথেষ্ট উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এই গবেষণায় প্রায় ৮.৪ কোটি কৃষিশ্রমিক শিশুর ওপর কীটনাশকের কোনো প্রভাবই বিবেচনা করা হয়নি। একইভাবে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বিশ্লেষণের বাইরে ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, কীটনাশকের কুপ্রভাব হিসেবে পারকিনসনস রোগের ক্রমবর্ধমান প্রমাণও মিলছে।
বিশ্বজুড়ে কীটনাশক কমানোর হাজারটা উদ্যোগ থাকলেও ব্যবহার এখনও থামেনি। কারণ, ২০২৩ সালে প্রায় ৩৮ লাখ টন কীটনাশক ব্যবহৃত হয়েছে, যা ১৯৯০ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। যদি সব নিয়ম কানুন মেনে বিশেষজ্ঞদের কথা শুনে চলাই হতো, তবে কীটনাশকের ব্যবহার তো কমার কথা ছিল, কিন্তু তা বেড়েছে, তাও আবার দ্বিগুণ হারে। তাই গবেষকেরা অত্যন্ত বিপজ্জনক কীটনাশক ধাপে ধাপে বন্ধ করা, নিরাপদ বিকল্প সহজলভ্য করা এবং বিষক্রিয়ার ঘটনা নথিবদ্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে একটি মানসম্মত নজরদারি ও রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, কৃষকের খাদ্য উৎপাদনের নিরাপত্তার পাশাপাশি তাঁর নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও কৃষিনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
সূত্র: https://www.theguardian.com/environment/2026/sep/02/50-per-cent-world-farmers-poisoned-pesticides-every-year-experts
