ক্যাপুচিন বানরের শিকারি রূপ

ক্যাপুচিন বানরের শিকারি রূপ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বনে খাবারের জোগান কমে গেলে বেঁচে থাকার কৌশলও বদলে যায়। ব্রাজিলের বেয়ার্ডেড ক্যাপুচিন বানরদের দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে এমনই এক আচরণ ধরা পড়েছে। ফলের প্রাপ্যতা কমে গেলে এই বুদ্ধিমান বানররা শুধু উদ্ভিদজাত খাবারের ওপর নির্ভর না করে সক্রিয়ভাবে ছোট মেরুদণ্ডী প্রাণী শিকার করতে শুরু করে। টিকটিকি, ইঁদুর থেকে শুরু করে সাপ, বাদুড়, গোসাপ এবং পাখির ছানাও তাদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে।

প্লস ওয়ান পত্রিকায় গবেষণার বিবরণটি প্রকাশিত হয়েছে। ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ফ্যাজেন্দা বোয়া ভিস্তাতে দুটি বন্য ক্যাপুচিন দলের ওপর ২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৪৫ মাস ধরে পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। গবেষকরা পাঁচ হাজার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বানরদের আচরণ নথিবদ্ধ করেন এবং মোট ৪৪৬টি মেরুদণ্ডী প্রাণী খাওয়ার ঘটনা শনাক্ত করেন। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ ছিল টিকটিকি এবং ২৮ শতাংশ ইঁদুর। পাশাপাশি অপসাম/থলিযুক্ত নিশাচর স্তন্যপায়ী প্রাণী, ইগুয়ানা/ গোসাপ ও পাখির ছানা খাওয়ার ঘটনাও প্রথমবার নথিভুক্ত হয়।

আসল বিষয় হল, ফল যত কমেছে, শিকারের প্রবণতা তত বেড়েছে। শুষ্ক মরশুমে একটি দলকে অতিরিক্ত বাদাম, ভুট্টা ও জল দেওয়া হয়েছিল। অন্য দলটি এই অতিরিক্ত খাবার পায়নি। দেখা যায়, অতিরিক্ত খাবার না-পাওয়া দলটি প্রায় দ্বিগুণ হারে ছোট প্রাণী শিকার করেছে। অর্থাৎ, খাদ্যের সংকটই তাদের শিকারে উৎসাহিত করেছে।

শিকারে লিঙ্গভেদও দেখা গেছে। পুরুষ বানররা স্ত্রীদের তুলনায় প্রায় ১.৪ গুণ বেশি মেরুদণ্ডী প্রাণী খেয়েছে এবং তুলনামূলকভাবে বিপজ্জনক শিকারেও বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। শুধু পুরুষদেরই সাপ খেতে দেখা গেছে। আবার বয়সের সঙ্গে শিকারের দক্ষতাও বেড়েছে। শিশু বানরদের মেরুদণ্ডী প্রাণী খাওয়ার হার ছিল পূর্ণবয়স্কদের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ; কিশোরদের ক্ষেত্রে তা পূর্ণবয়স্কদের কাছাকাছি।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, বানররা অনেক সময় প্রাণীর সাধারণ মাংসের বদলে প্রথমে মস্তিষ্ক ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গ খেত। এসব অঙ্গে চর্বি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি বেশি থাকায় খাদ্যাভাবের সময় এগুলো দ্রুত শক্তি জোগাতে পারে।

 

গবেষকদের মতে, এই আচরণ মানব বিবর্তনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২০ লক্ষ বছর আগের মানব পূর্বপুরুষদের বসতিস্থানে ছোট প্রাণীর অবশেষ পাওয়া যায়। বড় শিকার ধরার আগে ছোট প্রাণী শিকার করাই হয়তো ছিল তুলনামূলক সহজ ও কার্যকর খাদ্যসংগ্রহের কৌশল। ক্যাপুচিনরা অবশ্য মানুষের পূর্বপুরুষের সরাসরি প্রতিরূপ নয়, তবে তাদের আচরণ দেখায়—খাদ্যসংকট, শরীরের আকার, অভিজ্ঞতা ও সুযোগ কীভাবে একটি বুদ্ধিমান প্রাইমেটকে উদ্ভিদভোজী খাদ্য থেকে সক্রিয় শিকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই প্রাচীন মানবস্থানীয় ছোট প্রাণীর হাড় ও দেহাবশেষ নতুন করে বিশ্লেষণ করলে মানুষের শিকারের প্রাথমিক ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে।

 

 

সূত্র:Monkeys Hunt Dangerous Prey When Fruit Runs Out, 45-Month Study Finds https://scitechdaily.com/monkeys-hunt-dangerous-prey-when-fruit-runs-out-45-month-study-finds/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 + fourteen =