আলোর গতি ছাড়িয়ে মহাকাশ ভ্রমণ ?

আলোর গতি ছাড়িয়ে মহাকাশ ভ্রমণ ?

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ওয়ার্প ড্রাইভ মানে দেশকালের বক্রতাকে কাজে লাগিয়ে আলোর গতি ছাড়িয়ে মহাকাশ ভ্রমণ করা‌। দশকের পর দশক ওয়ার্প ড্রাইভ কিছুটা কল্পবিজ্ঞানের বিষয় বলেই গণ্য ছিল। গল্প বা সিনেমায় প্রায়ই দেখানো হয়, একটি মহাকাশযান নিজের চারপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে একটি বিশেষ বুদ্‌বুদ তৈরি করছে এবং মুহূর্তের মধ্যে পাড়ি দিচ্ছে বিপুল দূরত্ব। এর মূল ধারণার শিকড় রয়েছে কিন্তু আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদে।

১৯৯৪ সালে পদার্থবিদ মিগেল আলকুবিয়ের একটি গাণিতিক মডেলের প্রস্তাব করেন, যা ওয়ার্প ড্রাইভ নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনাকে নতুন মাত্রা দেয়। তাঁর ধারণায় মহাকাশযানকে সরাসরি আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে ছুটতে হবে না। বরং মহাকাশের স্থান-কালকেই মহাকাশযানের চারপাশে পরিবর্তিত করা যেতে পারে। ওই মডেল অনুযায়ী, মহাকাশযানের সামনে স্থান সংকুচিত এবং পেছনে স্থান প্রসারিত হবে। ফলে মহাকাশযানটি নিজের স্থানীয় পরিবেশে আলোর গতির চেয়ে ধীরই থাকবে, কিন্তু তার চারপাশের ওয়ার্প বুদ্‌বুদ স্থান-কালকে পরিবর্তন করে তাকে বিপুল দূরত্বে নিয়ে যেতে পারবে।

তবে এই ধারণার সঙ্গে ছিল একটি বড় সমস্যাও। আলকুবিয়েরের মূল মডেলে এমন এক ধরনের ঋণাত্মক শক্তির প্রয়োজন দেখা দেয়, যাকে আমরা বিপুল পরিমাণে তৈরি, সংরক্ষণ বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। ফলে ওয়ার্প ড্রাইভ দীর্ঘদিন বাস্তব প্রযুক্তির চেয়ে গাণিতিক কল্পনার কাছাকাছিই থেকে যায়।

পরবর্তীকালে গবেষকেরা অবশ্য কিছু চমকপ্রদ সম্ভাবনার সন্ধান পান। নতুন কিছু তাত্ত্বিক গবেষণায় এমন ওয়ার্প-বুদ্‌বুদের সমাধানের প্রস্তাব করা হয়েছে, যেগুলো আলোর গতির চেয়ে কম গতিতে চলতে পারে এবং তুলনামূলকভাবে ধনাত্মক শক্তি ব্যবহার করতে পারে। কিছু গবেষণায় আবার বিশেষ ধরনের মহাকর্ষীয় পরিবেশ কাজে লাগিয়ে ঋণাত্মক শক্তির প্রয়োজন কমানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বিজ্ঞানীরা ওয়ার্প ইঞ্জিন তৈরি করে ফেলেছেন। এখনও এমন কোনো বাস্তব ওয়ার্প বুদ্‌বুদ তৈরি হয়নি, যাতে একটি মহাকাশযানকে আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে পাঠানো সম্ভব। এমনকি ধনাত্মক শক্তি ব্যবহারকারী প্রস্তাবিত মডেলগুলোও আলোর চেয়ে ধীরগতির। তাই কল্পবিজ্ঞানের মতো মুহূর্তে এক নক্ষত্র থেকে অন্য নক্ষত্রে যাওয়ার প্রযুক্তি এখনও বহু দূরের ব্যাপার।

তবু ওয়ার্প ড্রাইভের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আলোর গতির সীমাকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ করে দেয়। সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ অনুযায়ী ভরযুক্ত কোনো বস্তুকে স্বাভাবিকভাবে ত্বরান্বিত করে আলোর গতিতে পৌঁছে দেওয়া যায় না। ওয়ার্প ড্রাইভ সেই বাধাকে সরাসরি ভাঙার চেষ্টা না করে প্রশ্ন তোলে- মহাকাশযানকে না ঠেলে যদি তার চারপাশের স্থান-কালকেই পরিবর্তন করা যায়? এই মুহূর্তে ওয়ার্প ড্রাইভ রয়েছে সমীকরণ, কম্পিউটার সিমুলেশন ও তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার জগতে। বাস্তবিক, স্থান-কালকে আমরা যতটা অদ্ভুত ভাবি, প্রকৃতি কি তার চেয়েও বেশি অদ্ভুত?

 

সূত্র: Alcubierre, M. (1994), The Warp Drive: Hyper-Fast Travel Within General Relativity; recent theoretical research on subluminal warp-drive solutions and energy requirements.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 + one =