সাগরের নীল জৈবপ্রভার বিপদ 

সাগরের নীল জৈবপ্রভার বিপদ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সমুদ্রের বুকে হঠাৎ নীল আলোর ঝলকানি /সি স্পার্কল (সামুদ্রিক জৈবপ্রভা)-কে বলে নক্টিলুকা সিন্টিলান্স। এই প্ল্যাঙ্কটন দেখতে যতটা মনোমুগ্ধকর, সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য তার ব্যাপক বিস্তার ততটাই উদ্বেগের। নতুন এক গবেষণা বলছে, ভারতের উপকূল অঞ্চলের জলে এই প্ল্যাঙ্কটনের প্রসার শুধু দূষণ, উষ্ণায়ন বা অক্সিজেনের ঘাটতির ফল নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে নদীর গতিপথে মানুষের হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে বাঁধ নির্মাণ।

প্ল্যাঙ্কটনরা হলো জলে ভেসে থাকা ক্ষুদ্র জীব। এদের মধ্যে ডায়াটমের মতো ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন/আণুবীক্ষণিক উদ্ভিদ সামুদ্রিক খাদ্যজালের ভিত্তি তৈরি করে। অন্যদিকে নক্টিলুকা সিন্টিলান্স নিজে সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে না; তারা ডায়াটম, ক্ষুদ্র শৈবাল, মাছের ডিম ও অন্যান্য অণুজীব খেয়ে বেঁচে থাকে। ঢেউ বা নড়াচড়ায় এর কোষে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে তৈরি হয় বিখ্যাত নীল আলো। বিপুল সংখ্যায় জমলে দিনের আলোয় জল গোলাপি বা লালও দেখাতে পারে। এ বিষয়ে

গবেষণার বিবরণটি গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ অ্যাডভান্সেস–এ প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণায় ১৯০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভারতের আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরে এই সি স্পার্কল ব্লুমের/ সামুদ্রিক অণুজীবের বৃদ্ধির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখা গেছে, গত ২৫ বছরে এর প্রকোপ বেড়েছে এবং ২০০০–২০২৫ কালে প্রায় ৪০টি ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। সমুদ্রের জলে দ্রবীভূত সিলিকেটের ঘাটতিই এই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

নদী স্বাভাবিকভাবে পলি ও সিলিকা সমুদ্রে পৌঁছে দেয়। এই সিলিকা ডায়াটমের বৃদ্ধি ঘটায়। কিন্তু বাঁধ ও জলাধার নদীর স্রোত ধীর করে বিপুল পরিমাণ পলি আটকে দেয়। গবেষণা অনুযায়ী, জলাধারে নদীর ৭০–৯০ শতাংশ ভাসমান পলি তলিয়ে যেতে পারে। ফলে সমুদ্রে কমে যায় সিলিকার সরবরাহ, দুর্বল হয় ডায়াটমের আধিপত্য। আর সেই পরিবেশে নক্টিলুকা বেশি সুবিধা পায়। গবেষণায় বাঁধের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সি স্পার্কল ব্লুম-এর বৃদ্ধির মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বঙ্গোপসাগরে বাঁধের কারণে ভবিষ্যতে সিলিকা প্রবাহ প্রায় ১৭ শতাংশ কমতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।

এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু জলের রং বদলানোয় সীমাবদ্ধ নয়। বিশাল পরিমাণ ব্লুম পচে গেলে অণুজীবরা প্রচুর অক্সিজেন ব্যবহার করে, ফলে জলে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয় এবং মাছসহ অন্যান্য প্রাণী বিপন্ন হতে পারে। জলের মধ্যে আলো প্রবেশ কমে যাওয়ায় সামুদ্রিক ঘাস ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদের বৃদ্ধিও ব্যাহত হয়। এর প্রভাব পড়ে খাদ্যজাল, মৎস্যসম্পদ, জলজচাষ ও উপকূলীয় মানুষের জীবিকায়। কিছু ক্ষতিকর ব্লুম মাছে ও শেল মাছে বিষাক্ত পদার্থ জমিয়ে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কার্বন চক্রের পরিবর্তন। ডায়াটম সমুদ্রের কার্বন গভীরে পৌঁছে দেয়। কিন্তু তাদের জায়গায় নক্টিলুকা বাড়লে সমুদ্রের গভীরে কার্বন সঞ্চালন দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

এই গবেষণাটি তাই নদী ও সমুদ্রকে আলাদা করে দেখার পরিবর্তে সমগ্র নদী অববাহিকা থেকে উপকূল পর্যন্ত একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছে। বাঁধ পরিচালনায় পলি ও সিলিকা প্রবাহ বজায় রাখা, নতুন বাঁধে পলি পরিবহনের ব্যবস্থা রাখা, জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এবং উপগ্রহ ও সরাসরি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আগাম ব্লুম শনাক্ত করা জরুরি।

সূত্র: When rivers meet the sea: How dams are influencing plankton blooms along India’s coasts. Source: Sander van der Wel from Netherlands via Wikimedia Commons.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 + 2 =