অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা 

অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গাছের শরীর স্থির ও নিশ্চল হলেও গাছ কিন্তু জড় নয়। আলো ও মাধ্যাকর্ষণের মতো বাহ্যিক সংকেতের পাশাপাশি নিজের কাণ্ডের অবস্থানও গাছ অনুভব করতে পারে। এমনকি প্রয়োজন অনুযায়ী তার বৃদ্ধির ধরন বদলে সেই বাঁক সংশোধনও করতে পারে। সম্প্রতি তরুণ পপলার গাছ নিয়ে এক গবেষণায় এক স্বয়ংক্রিয় শারীরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা-র সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। দেখা গেছে, কাণ্ড বাঁকা হয়ে গেলে গাছ বিশেষ ধরনের কাঠ তৈরি করে, যার টান অনেকটা পেশির মতো কাজ করে কাণ্ডকে আবার সোজা করে।

ফ্রান্সের INRAE এবং University Clermont Auvergne-এর গবেষকেরা দেখিয়েছেন, এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা কাষ্ঠল চাপের। কাণ্ডের বিশেষ এক ধরনের কাঠ সংকোচনশীল টান তৈরি করে গাছের অঙ্গকে নির্দিষ্ট দিকে টেনে নেয়। গবেষণাটি বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে নিউ ফাইটোলজিস্ট পত্রিকায়।

এতদিন মনে করা হতো, গাছের কাণ্ড একদিকে হেলে পড়লে তার উপরের দিকে কাষ্ঠল টান তৈরি হয় এবং সেই কাঠের টানে কাণ্ড ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে যায়। কিন্তু কোনও বাঁকা কাণ্ডকে সম্পূর্ণ সোজা করতে হলে শুধু ঊর্ধ্বমুখী বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। গাছকে নিজের কাণ্ডের প্রকৃত বক্রতাও বুঝতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাঠ তৈরির স্থান পরিবর্তন করতে হবে।

নিজের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থাকার ক্ষমতাকে প্রাণীদের ক্ষেত্রে বলা হয় প্রোপ্রিওসেপশন। উদ্ভিদের মধ্যেও এই ক্ষমতার প্রমাণ আগেই পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সেই অনুভূতি কীভাবে কাণ্ডের বৃদ্ধির মতো জটিল জৈবিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেটা অজানা ছিল।

এই রহস্যের সন্ধানে গবেষকেরা প্রথমে তরুণ পপলার গাছকে অনুভূমিকভাবে স্থাপন করেন। প্রায় ১০ দিনের মধ্যে কাণ্ডের উপরের দিকে কাষ্ঠল টান তৈরি হয় এবং তার টানে গাছের ডগা উপরের দিকে উঠতে থাকে। এরপর গাছগুলোকে উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে অভিকর্ষ বা আলোর প্রভাব পরীক্ষা করার জন্য ব্যবহৃত ঘূর্নায়মান যন্ত্রে রাখা হয়। তার নাম ক্লাইনোস্ট্যাট। সেখানে আলো চারদিক থেকে সমানভাবে আসে এবং যন্ত্রের ঘূর্ণনের কারণে মাধ্যাকর্ষণের নির্দিষ্ট দিকও গাছের জন্য কার্যত অনুপযোগী হয়ে যায়। ফলে গাছের ভঙ্গি নিয়ন্ত্রণে প্রধান অবলম্বন হয়ে থাকে তার নিজের কাণ্ডের বক্রতা অনুভব করার ক্ষমতা।

পরীক্ষায় দেখা গেল,কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাঁকা কাণ্ড ধীরে ধীরে সোজা হয়ে গেছে। কাণ্ডে নতুন তৈরি কাঠ পরীক্ষা করে দেখা গেল, যে-পাশে আগে কাষ্ঠল চাপ তৈরি হয়ে কাণ্ডকে টেনে তুলছিল, সেখানে তার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবর্তে বিপরীত পাশে একই ধরনের কাঠ তৈরি হয়েছে। এই নতুন কাঠের টান আগের টানের বিপরীতে কাজ করে এবং ধীরে ধীরে কাণ্ডের বাঁক কমিয়ে তাকে সোজা করে।

অর্থাৎ, গাছের কাঠের মধ্যেই যেন কাজ করছে একটি সূক্ষ্ম সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া চক্র। যার কাজ হল, কাণ্ডের বক্রতা অনুভব করা এবং সেই তথ্য অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে নতুন কাঠ তৈরি করে ভঙ্গি সংশোধন করা। অনেকটা পেশির মতো চাপ-এর এই নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার গাছের আত্ম-সংশোধন ক্ষমতার এক নতুন দিক তুলে ধরেছে।

এই আবিষ্কারের একটা ব্যবহারিক গুরুত্বও রয়েছে। ঝড়, ভূমিধস বা অন্যান্য পরিবেশগত চাপে গাছ কীভাবে নিজের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করে, তা বোঝার পাশাপাশি কাঠের গুণমান উন্নত করার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হতে পারে।

 

সূত্র: “Proprioception drives tension wood formation for autotropic straightening and postural control in trees” by Alexandre Caulus, Félix P. Hartmann,et.al; 2nd September 2026, published in New Phytologist. DOI: 10.1111/nph.71238

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine − 9 =