কিছু অণু একই রাসায়নিক গঠন বজায় রেখেও একে অপরের দর্পণ- প্রতিবিম্ব হিসেবে দুটি ভিন্ন রূপে থাকতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় কাইরালিটি। আশ্চর্যের ব্যাপার, জীবজগতে এই দুই রূপ সাধারণত সমানভাবে দেখা যায় না। যেমন, অ্যামিনো অ্যাসিডের দুটি কাইরাল রূপ সম্ভব হলেও জীবদেহের প্রোটিনে মূলত একটি রূপই ব্যবহৃত হয়। জীবনের এই একমুখী রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় হোমোকাইরালিটি। দীর্ঘদিন ধরে এর উৎপত্তি রসায়নে অমীমাংসিত ছিল।
এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি রসায়নবিদ অঁরি বি. কাগান এবং জাপানি রসায়নবিদ কেনসো সোয়াই। কাগান-এর জন্ম ১৯৩০ সালে, ফ্রান্সে। তিনি প্যারিসের উচ্চতর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর । কেনসো সোআই -এর জন্ম জাপানের হিরোশিমায়। তিনি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর ।
এঁদের গবেষণার মূল বিষয় হল, কীভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় দুটি সম্ভাব্য আয়না-বিম্বের মধ্যে একটিকে প্রাধান্য দেওয়া যায় এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় একটিমাত্র রূপ তৈরি করা সম্ভব হয়।
সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কোনো অণুর দুটি কাইরাল রূপ তৈরির সম্ভাবনা থাকলে সাধারণত উভয় রূপই প্রায় সমান পরিমাণে উৎপন্ন হয়। কিন্তু জীবনের রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রকৃতি এই সমতা ভেঙে দিয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য শুধু মৌলিক বিজ্ঞানের জন্য নয়, ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই অণুর দুটি আয়না-বিম্বের জৈবিক কার্যকারিতা ভিন্ন হতে পারে। একটি কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাগত প্রভাব সৃষ্টি করে করলেও অন্যটি তা নাও করতে পারে।
১৯৮৬ সালে অঁরি কাগান এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটান। তিনি রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের এমন একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যার মাধ্যমে একটি কাইরাল রূপ অন্যটির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পরিমাণে উৎপন্ন করা সম্ভব হয়। এর ফলে অসমমিত রাসায়নিক সংশ্লেষণের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এরপর কেনসো সোয়াই এই ধারণাটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯৯৫ সালে তিনি এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা প্রকাশ করেন, যার মধ্যে একটি কাইরাল রূপকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রাধান্য দেওয়ার সম্ভাবনা ছিল। শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে তিনি এমন একটি বিক্রিয়া সফলভাবে প্রদর্শন করেন, যেখানে সম্ভাব্য দুটি আয়না-বিম্বের মধ্যে কেবল একটি রূপই তৈরি হয়। জীবনের স্বাভাবিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ার বাইরে এ ধরনের সাফল্য সেই প্রথম অর্জিত হল।
কাগান ও সোয়াইয়ের গবেষণা দেখিয়েছে, জীবনের একমুখী রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য আর কেবল প্রকৃতির এক রহস্য নয়। উপযুক্ত রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেটিকে পরীক্ষাগারেও সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাঁদের এই আবিষ্কারের গুরুত্ব বিশেষত ওষুধ ও অন্যান্য জৈব-সক্রিয় অণুর নির্দিষ্ট কাইরাল রূপ তৈরিতে খুবই উল্লেখযোগ্য। ফলে তাঁদের কাজ একদিকে হোমোকাইরালিটির দীর্ঘদিনের রহস্যের সমাধান করেছে, অন্যদিকে আধুনিক ঔষধ-রসায়নের জন্যও নতুন পথ খুলে দিয়েছে।
সূত্র : NobelPrize.org. Nobel Prize Outreach 2026. Wed. 7 Oct 2026. <https://www.nobelprize.org/prizes/chemistry/2026/press-release/>
