বনভূমি অক্ষত রেখেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন

বনভূমি অক্ষত রেখেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১১ অক্টোবর, ২০২৬

নবায়নযোগ্য শক্তির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জমির প্রয়োজনও বাড়ছে। প্রচলিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তুলতে প্রায়ই বিস্তীর্ণ জমির গাছপালা সরিয়ে ফেলতে হয়। এতে একদিকে যেমন বনভূমি নষ্ট হয়, অন্যদিকে কার্বন সঞ্চয়, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও মাটির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াও ব্যাহত হয়। এই সমস্যার বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষকেরা সম্ভাবনা দেখছেন সোলার ট্রি বা সৌরবৃক্ষ প্রযুক্তিতে। এই পদ্ধতিতে গাছের মতো শাখা-প্রশাখাযুক্ত উঁচু কাঠামোর ওপর সৌরপ্যানেল/সৌরকোষ বসানো হয়, যাতে নীচের জমিতে থাকা গাছপালা ও অন্যান্য উদ্ভিদ অক্ষত রাখা সম্ভব হয়।

প্রচলিত সৌরপ্যানেল সাধারণত মাটির কাছাকাছি সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়। বিপরীতে, সোলার ট্রিতে প্যানেলগুলি উঁচু ও শাখাবিশিষ্ট কাঠামোর ওপর স্থাপন করা হয়। ফলে একই জমির ওপরের অংশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, অথচ নীচের উদ্ভিদ আচ্ছাদন অনেকাংশে বজায় থাকে। বিশেষত যেসব দেশে জমির পরিমাণ সীমিত এবং বনভূমি সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই প্রযুক্তি কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

২০২৫ সালে কোরিয়া মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের গবেষক ডান-বি উম দক্ষিণ কোরিয়ার একটি উপকূলীয় বনাঞ্চলে সোলার ট্রির সম্ভাব্য কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা করেন। ত্রিমাত্রিক ভূ-স্থানিক সিমুলেশন এবং নির্দিষ্ট মানদণ্ডে পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি সারিবদ্ধ সোলার ট্রি ও প্রচলিত স্থির সৌরপ্যানেল ব্যবস্থার তুলনা করেন।

সিমুলেশনের ফলাফলে দেখা যায়, সোলার ট্রি ব্যবহার করলে বিদ্যমান বনভূমির প্রায় ৯৯ শতাংশ অক্ষত রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে, গবেষণায় বিবেচিত বিন্যাসে এই ব্যবস্থা প্রচলিত সৌরপ্যানেলের সমতুল্য। এমনকি তার চেয়েও বেশি স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, ওই স্থানে প্রচলিত পদ্ধতিতে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা অর্জন করতে হলে বনভূমির প্রায় ৯৮ শতাংশ পরিষ্কার করতে হতো। অর্থাৎ, সৌরবৃক্ষ প্রযুক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বন সংরক্ষণের মধ্যে সংঘাত কমাচ্ছে।

একটা বনভূমি তো শুধু কিছু গাছের সমষ্টি নয়। এটি কার্বন শোষণ ও সঞ্চয় করে, অসংখ্য প্রজাতির আবাসস্থল জোগায়, মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং জলচক্রের ভারসাম্য বজায় রাখে। তাই নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের জন্য বন ধ্বংসের প্রয়োজন কমাতে পারলে তার বহুমুখী পরিবেশগত সুফল পাওয়াও সম্ভব হবে।

তবে সোলার ট্রি প্রযুক্তিটি এখনও প্রচলিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সর্বজনীন বিকল্প নয়। উঁচু ও জটিল কাঠামো নির্মাণে ব্যয় বেশি হতে পারে। তা ছাড়া, গবেষণার ফলাফল মূলত কম্পিউটারভিত্তিক মডেলিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাপক বাণিজ্যিক ব্যবহারে এর কার্যকারিতা এখনও আরও যাচাই করা প্রয়োজন। তবে এইটুকু বলা যায়, বনভূমি ধ্বংস না করে সোলার ট্রি প্রযুক্তিতে স্বচ্ছ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ তৈরি করা সম্ভব ।

সূত্র: Scientific Reports, 2025, Korea Maritime Institute research.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 + 14 =